বিজয় দাস – ‘কোয়ারেন্টাইনে পৃথিবী’

আমরা একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও সভ্যতার অগ্রগতির এমন এক জায়গায় অবস্থান করছি যেখানে আত্মবিশ্বাসের অহং ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। যেখানে বিজ্ঞানের আস্ফালন আমাদের জানাচ্ছে মহাবিশ্বের বিভিন্ন ক্ষতির থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার শক্তি তাদের আছে। অবশ্যই আছে! বিজ্ঞানের শক্তি ও ক্ষমতার উপর প্রশ্ন করার মতো জ্ঞান আমার নেই। কিন্তু যতটুকু জানা ততটুকুই তো ক্ষমতা। এমনই এক অজানা ভাইরাসের কথা এবং চর্চা যতই বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানতে পারছি ততই সত্যজিৎ রায়-এর প্রফেসর শঙ্কুর একটা গল্পের কথা মনে আসছে, গল্পটার নাম ‘গোলক রহস্য’, আপনারা যারা গল্পটা পড়েছেন তারা একটু ভালোভাবে মনে করলেই বুঝতে পারবেন মিলটা কোথায়। মানুষের সামনে নগণ্য এক জীব, অণুবীক্ষণ যন্ত্রেও যাদের দেখা পাওয়া কঠিন তারাই শুরু করেছে মানব সভ্যতার এই ধ্বংস যজ্ঞ। এবং অবশ্যই ধর্মীয় বিশ্বাসে দাঙ্গা, রাজনীতি করে মৃত্যু ও মৃতের মিছিল করার থেকে বিজ্ঞানের উপর আস্থা রাখাটাই একান্ত প্রয়োজনীয়।

এক মারণ ভাইরাস আজ সমস্ত পৃথিবীতে মানব সভ্যতার অগ্রগমনের পথকে হঠাৎ করে ঘরবন্দি করে তুলেছে। সমগ্র পৃথিবী মহামারিতে আক্রান্ত। আজকের এই সময়ে ডাব্লিউ.এইচ.ও. তথ্যের ভিত্তিতে জানা যাচ্ছে সমগ্র বিশ্বের প্রায় বত্রিশ লক্ষ মানুষ এই মারাত্মক ভাইরাসের কবলে রয়েছেন এবং প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ মারা গেছেন। এই সব তথ্য আমার নতুন করে দেওয়া অর্থহীন, কারণ এখন প্রতিনিয়ত এই একই খবর আমরা বারবার শুনে চলেছি। গতকাল কতজন ছিল, আর আজ কতজন হল? এরপরের থাবাটা যেন আমার বা আমার পরিবারের উপর না পরে সেই ভয়ে অথবা সরকারের লকডাউনের সিদ্ধান্তে একপ্রকার অসহায় অবস্থাতেই গৃহবন্দি প্রতিটি মানুষ। এমন বন্দি, অকর্মণ্য পরিস্থিতিতে এই প্রজন্মের মানুষ কখনও পড়েছেন বলে মনে হয় না। কিছুদিন আগেও আমাদের দৈনন্দিন ব্যস্ত জীবনে অনেক কিছু করার থাকলেও সময়ের অভাব তা হয়ে ওঠে নি, কিন্তু এখন…। একবার ভাবুন এখন আপনার কত সময় রয়েছে, কিন্তু কাজের অভাব। আপনার সময়ের অনুপাতে করার মতো কাজই নেই, শুধু বারবার ফেসবুকের নিউস্‌ ফিড স্ক্রোল করা ছাড়া বা হোয়াটস্‌ অ্যাপ, ইন্টাগ্রাম, টিক-টক ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানেই কিন্তু আসছে সেই নিউটনের তৃতীয় সূত্র, ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।’ অর্থাৎ বৈপরীত্যই প্রকৃতির ধর্ম। কোনও কিছুই সর্বকালীন সমান্তরাল চলতে পারে না। এই অবস্থা আমাদের মেনে নিতেই হবে।

এই লেখাটি যখন লিখছিলাম ৫ই এপ্রিল, রাত প্রায় ৯.৩০মিনিট, তখন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মহাশয়ের আহ্বানে ঘরের লাইট বন্ধ করে মোমবাতি প্রজ্বলন উৎসবে আশেপাশের সব বাড়ি অংশগ্রহণ সাথে কোনও এক মহানুভব রাস্তার লাইটও বন্ধ করে দিলেন। সত্যি উৎসবই বটে! তবে একটা জিনিস খুব ভালো লাগছে দেশের এই অসময়ে বিখ্যাত মানুষদের দান করার প্রতিযোগিতা দেখে, এবং কিছুদিন আগের হাততালি ও বাসন পেটানোর মতো ঢেঁড়া পিটিয়ে জাহির করার চমকদারি বিজ্ঞাপন। তবে কুর্ণিশ অবশ্যই জানানো উচিৎ আমাদের দেশ এবং রাজ্যগুলির প্রধানদের, তাদের সাধ্য বা কিছু ক্ষেত্রে সাধ্যাতীত কাজ ও পরিকল্পনা আমাদের দেশকে অনেকটাই সুস্থ রাখতে পেরেছে অন্যান্য অনেক দেশগুলির তুলনায়।

এইরকম পরিস্থিতিতে সবাই ঘরের চারদেওয়ালে বন্দি—আমি, আপনি এবং আমাদের প্রিয়জনেরা। নোবেল বিজয়ী পলিশ কবি উইস্লাওয়া সিজ্বোর্সকা বলেছিলেন কবি হতে প্রয়োজন চারটি দেওয়াল এবং একাগ্র নীরবতা। সেক্ষেত্রে হয়ত কিছু কবিরা এখন বেশ ভালোই আছেন, যদিনা কোনও সাংসারিক গোলযোগ তাদের একাগ্রতা ভঙ্গ করে। কিংবা কিছু মানুষ হয়ত নতুন কবি হয়েও উঠবেন। কিন্তু যারা এই কিছুর মধ্যে পরেন না, তাঁরা কীভাবে কাটাচ্ছেন এই অবসর! তাঁরা কি উপভোগ করছেন, না এতদিনের বন্দিদশায় জমে উঠছে নৈরাশা! …বলতে পারব না। কিন্তু যেটা বলতে পারি প্রায় সকলের মধ্যেই কিন্তু বহু প্রশ্নের পাহাড় জমছে, মনের ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশ্নজাল এবং আতঙ্ক। এই লকডাউনের শেষে কি হবে? কীভাবে এই মহামারি থেকে মুক্তি পাবে ভারত? এই রকম বহু প্রশ্ন। তবে পুরো পৃথিবীর সাথে ভারতও লড়াই করছে। কিন্তু আমার মতে আসল লড়াই এখনও শুরুই হয়নি, লড়াইয়ের সময় আসছে আগামি দিনে। এই লকডাউন পরিস্থিতির ফলে বিভিন্ন বৃহৎ থেকে ক্ষুদ্র সমস্ত শিল্পে উৎপাদন একেবারে বন্ধ, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। যা এক চিন্তার বিষয়। ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যতই বলবে তবে আমাদের প্রত্যেকটি মানুষের আরও সংযমী ও শান্ত হওয়ার প্রয়োজন আছে।

আজ বিশ্বের শক্তিশালী ও অর্থবান দেশগুলি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে মুক্ত নয়। বরং তাদের অসাবধানতা ও আত্মবিশ্বাস তাদের ক্ষতির একমাত্র কারণ হয়ে উঠেছে। আমেরিকা, ইতালি, স্পেন, ইংল্যান্ড, চিন, জার্মানি, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশে এই ভাইরাসের প্রকোপ যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা ভয়াবহ। ইতিহাস বলছে ১৭২০, ১৮২০, ১৯২০ ও ২০২০ প্রতি একশ বছর অন্তর পৃথিবী সংক্রমিত হয়েছে বিভিন্ন মারাত্মক ব্যাধিতে এবং তা কাটিয়েও উঠেছে। তবে বহু মৃত্যুর তকতকে স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলছে। কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে পুরো পৃথিবী, মুখে মাস্ক বেঁধে, হাত স্যানিটাইজ করে বাজার বা রেশনে লাইন দিচ্ছে; চায়ের দোকানে জটলা করছে, আবার পুলিশের কাছে মারও খাচ্ছে। সবচেয়ে জরুরি কথা আমাদের প্রত্যেককে সজাগ ও সতর্ক হতে হবে, অবস্থার গুরুত্ব বোঝা আবশ্যক। সব দোষ সরকার ও মন্ত্রীদের ঘাড়ে চাপানো সম্ভব নয়, নিজেদেরও দায়িত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা প্রয়োজন।

‘Sing, O goddess, the anger of Achilles son of Peleus, that brought countless ills upon the Achaeans. Many a brave soul did it send hurrying down to Hades, and many a hero did it yield a prey to dogs and vultures, for so were the counsels of Jove fulfilled from the day on which the son of Atreus, king of men, and great Achilles, first fell out with one another.’

— হোমার, ‘ইলিয়ড’

Your Review

Please Login to Comment.