রাহুল দাশগুপ্ত – “এমিলি ব্রন্টির ‘উদারিং হাইটস’ নীরবতার অসমাপ্ত জগৎ ” ১

Spread the love

Bronte_Charlotte

নৈঃশব্দের মধ্যে যখন শব্দ তৈরি হয়, তখন তার খেয়ালিপনার জন্য তাকে অভিযুক্ত করা যায় না। নীরবতার অসামাপ্ত জগতের মধ্যে শব্দগুলি তখন এলোমেলো ছুটে বেরায়। তাদের বেঁধে রাখা যায় না। শাসন করা যায় না। তাদের ওপর প্রচলিত নিয়ম-প্রথার কোনও জোর খাটে না। শব্দগুলি নিজের খেয়ালে এমন এক সমান্তরাল বাস্তবতা তৈরি করে, যার কোনও দায়বদ্ধতা নেই। সে দায়বদ্ধ কেবল তার বিচ্ছিন্নতা ও স্বাধীনতার কাছে। বিশ্বে খুব হাতে গোনা সাহিত্য রচনাই আছে, যারা উৎসারিত হয়েছে নিখাদ ‘নিঃশব্দ’ থেকে। এমিলি ব্রন্টির ‘উদারিং হাইটস’ সেই হাতে গোনা সাহিত্যসৃষ্টির মধ্যে পড়ে। এই সেই নারী যিনি গৃহস্থালীতে মনোনিবেশ করেন নি, নীড় ছেড়ে তিনি চলে গেছেন আকাশের দিকে। তাঁর উপন্যাস সেই কসমিক বা মহাজাগতিক স্তরে পৌঁছেছে, যে স্তরে রয়েছে দস্তয়েভেস্কি বা তলস্তয়ের উপন্যাস।

এমিলি ব্রন্টির জন্ম ১৮১৮ সালের ৩০ জুলাই। আর মৃত্যু ১৮৪৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর। তিনি ছিলেন ‘জেন আয়ার’ খ্যাত শার্লোট ব্রন্টির ছোট বোন। মায়ের মৃত্যুর সময় এমিলির বয়স ছিল মাত্র তিন। অল্প বয়স থেকেই এমিলি ছিলেন স্কট, বায়রন, শেলীর মুগ্ধ পাঠক। তিনি নিংসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন জীবন পছন্দ করতেন। শুধু প্রকৃতি ও জীবজন্তুর প্রতি ছিল অস্বাভাবিক ভালোবাসা। ‘উদারিং হাইটস’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৪৭ সালে, লন্ডনে। এই উপন্যাসে যে তীব্র ভায়োলেন্স আর প্যাশন রয়েছে, তা সেইসময় পাঠকদের একদম চমৎকৃত করে দিয়েছিল। মাত্র ত্রিশ বছরে মারা যান এমিলি। একদিকে ভাইয়ের মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে যক্ষ্মার আক্রমণ। তাছাড়া ডাক্তার দেখাতেও অস্বীকার করেছিলেন তিনি। মৃত্যুর সময় তিনি এতোই শীর্ণ হয়ে গেছিলেন, যে তাঁকে দেখলে লোকে চমকে যেতো।

তুর্গেনেভের উপন্যাসের কথা ভাবা যাক। তাঁর সব লেখার উৎসই ‘শব্দ’। বা জ্যঁ পল সার্ত্র। শব্দের বিকৃত জগতকে চাবকে সিঁধে করতে তিনিও নির্মাণ করেছেন পাল্টা শব্দ। তুর্গেনেভ বা সার্ত্র দায়বদ্ধ তাঁদের দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি। এমিলি ব্রন্টির এরকম কোনও দায়বদ্ধতা নেই। তাঁর দায়বদ্ধতা কেবল নিজের আত্মার কাছে। সেই আত্মাকে মেলে ধরার কাছে। সর্বসাধারণের বাস্তবতা, তাঁর স্থান-কাল-চরিত্রের সীমাবদ্ধতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার কাছে। এবং সেই বিচ্ছিন্ন প্রাকারের সীমাহীন পরিধির বিস্তারে ব্যক্তিগত নৈঃশব্দের ডিম ভেঙে ভেঙে শব্দের ছানাগুলিকে মুক্তি দেওয়ার কাছে। এমিলি ব্রন্টি নৈঃশব্দের মুক্তি চান শব্দের কাছে। তার শব্দ নৈঃশব্দ দিয়ে ঘেরা। তাই এই শব্দ বিচ্ছিন্ন ও স্বাধীন। সমান্তরাল ও স্বীকারোক্তিমূলক। খুব কম লেখকই তাদের নৈঃশব্দের জন্য এইভাবে বিচ্ছিন্ন ও সমান্তরাল একটি বাস্তবতাকে তৈরি করে নিতে পারেন। তারপর সেই নবনির্মিত বাস্তবতার জমিতে খেয়ালখুশি মতো বুনে নিতে পারেন শব্দের চারাগুলি।

আর এখানেই এমিলি ব্রন্টির সঙ্গে অসম্ভব মিল আছে একজনের। হ্যাঁ, বিশ্বের মহত্তম ঔপন্যাসিক ফিওদোর দস্তয়েভস্কির কথাই আমি বলছি। দস্তয়েভস্কির লেখার উৎস মূলত ‘শব্দ’। তারপর সেই ‘শব্দ’ থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় এক সীমাহীন নৈঃশব্দের জগৎ। সেই নৈঃশব্দের ফের মুক্তি ঘটে ‘শব্দে’র জগতে। দস্তয়েভস্কি তাঁর সমকালীন বাস্তবতা সম্পর্কে অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। তাঁর সমাজ-সংশ্লিষ্টতা তাঁর যেকোনও লেখার উৎস। কিন্তু সেই সমাজের শব্দময় সীমাবদ্ধ বাস্তবতায় নৈঃশব্দের অসীম জগৎ বিস্তার করে চলে তাঁর চরিত্রেরা। এই চরিত্রেরা আদপেই চরিত্র নয়, এরা প্রত্যেকেই একেকটা ‘আইডিয়া’ বা ‘ধারনা।’ আর এই চরিত্রগুলির মধ্য দিয়েই মুক্তি ঘটে তাঁর আত্মার, ফিরে আসে শব্দের জগৎ। সীমাবদ্ধ বাস্তব-জগৎ বিশ্লিষ্ট হয়ে জন্ম নেয় এক উত্তীর্ণ অসীম আধ্যাত্মিক জগতের।

দস্তয়েভস্কির ‘ইডিয়ট’ উপন্যাসটি ধরা যাক। ‘প্রিন্স মিশকিন’ চরিত্রটি একটি নিছক নির্দিষ্ট ‘আইডিয়া।’ দস্তয়েভস্কি এমন একটি চরিত্র সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, যার মধ্য দিয়ে স্বয়ং ঈশ্বর আত্মপ্রকাশ করবেন। এমিলি ব্রন্টি তৈরি করলেন এমন একটি চরিত্র, যার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করলো স্বয়ং শয়তান। তাই বলা যায়, ‘ইডিয়ট’ ও ‘উদারিং হাইটস’ –যেন বিশ্ব-উপন্যাসের দুটি বিপরীত প্রান্তবিন্দুতে অবস্থিত। মিশকিন ও হিথক্লিফ-একে অন্যকে সর্বদাই ভেংচি কেটে যাচ্ছে। তবে উপন্যাস দুটির মিল একটাই। দুটি উপন্যাসেরই লেখক আসলে ‘ম্যান/ উওম্যান অব গড।’ এমিলি ব্রন্টি চরিত্রায়িত করলেন শয়তানকে। অথচ তিনি ‘উওম্যান অব গড।’ এই আপাত-বিরোধিতার সমাধান খোঁজাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

উদারিং হাইটস আর থ্রাসক্রস গ্র্যাঞ্জ। পাশাপাশি দুটি জমিদার। ‘উদারিং হাইটস’-আর্নশ’দের জমিদার। থ্রাসক্রস গ্র্যাঞ্জের জমিদার লিনটনরা। বুড়ো আর্নশ’র এক ছেলে হিন্ডলে। এক মেয়ে ক্যাথারিন। লিনটনেরও দুই সন্তান। ছেলের নাম এডগার। মেয়ে ইসাবেলা। আর্নশ’রা খুব শক্তপোক্ত, মেজাজি আর আবেগপ্রবণ। লিনটনরা স্বভাবে নরম, রুগ্ন ও সংযমী। বুড়ো আর্নশ একবার লিভারপুল গেলেন। ফিরে এলেন একরত্তি এক শিশুকে নিয়ে। ছেলেটাকে দেখিয়ে আর্নশ বললেন, ‘জিনিসটা এমন কালো যে মনে হবে শয়তানের কাছ থেকে পাওয়া।’ কিন্তু এটাকে বাড়ির সবাইকে তিনি ‘ঈশ্বরের দান’ হিসেবেই গ্রহণ করতে বললেন।

‘শয়তানের কাছ থেকে পাওয়া’ অথচ ‘ঈশ্বরের দান’ –এই ছেলেটিই ‘হিথক্লিফ।’ তার নাম ওইটুকুই। তার কোনও পরিবার নেই, বংশপরিচয় নেই, জন্মাবধি সে জানে না তার আত্মপরিচয়, অর্থনৈতিকভাবেও সে নিঃস্ব। এক কথায়, শেকড়হীন একটি মানুষ। ছেলেটি শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী, মানসিকভাবে জেদি ও একরোখা, তবে নিজের আবেগকে সংযত রাখতে পারদর্শী। বুড়ো আর্নশ মারা যাওয়ার পর পরিবারের নতুন মালিক হিন্ডলে তার ওপর ভয়ানক অত্যাচার শুরু করে। ভাগ্যের এই নির্মমতাকে সে মুখ বুজে সহ্য করে আর ভালোবাসে। তার সান্ত্বনা তার ভালোবাসা। তার প্রেম। আর এই প্রেমিকাটি হলেন হিন্ডলেরই বোন। ক্যাথারিন আর্নশ।

কিন্তু এবারও ভাগ্য নির্দয় হয়ে ওঠে তার প্রতি। এডগার লিনটন বিয়ের প্রস্তাব দেয় ক্যাথারিনকে। ক্যাথারিন জানে, তার ও হিথক্লিফের আত্মা একই রকম। এডগারের আত্মা আলাদা। যেমন, বিদ্যুৎ আর চাঁদের আলো আলাদা, যেমন আগুন আর তুষারে মিল নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে এডগারের প্রস্তাব গ্রহণ করে। কেননা, হিথক্লিফের সঙ্গে বিয়ে হলে তারা একজোড়া ‘ভিখারি’ হবে। অতএব, ‘একটা ফুলের টবে ওক গাছ বসিয়ে ভাবা’ হলো, ওক গাছটি তরতরিয়ে বেড়ে উঠবে। ক্যাথারিনের সঙ্গে এডগারের বিয়ে হয়ে গেল। হিথক্লিফ পালিয়ে যায়।

ক্রমশ প্রকাশ্য...

 


Spread the love
‘ নাগিব মাফ্যুজের জীবনচক্রের দলিল ও একটি অর্ধেকদিনের খসড়া ’ – শুভংকর গুহ
রাহুল দাশগুপ্ত – “এমিলি ব্রন্টির ‘উদারিং হাইটস’ নীরবতার অসমাপ্ত জগৎ ” ২
Close My Cart
Close Wishlist
Recently Viewed Close

Close
Navigation
Categories

Add address