সুকান্তি দত্ত – “ সব ডাস্টবিন হয়ে যাক ”

Spread the love

illustration1

শিল্পীঃ সুদীপ চক্রবর্তী

অফিস টাইমের ভিড়ঠাসা ট্রেনের কামরা, ঘেঁষাঘেঁষি-ঠেলাঠেলি-চাপাচাপি-ঘষাঘষি। নানা বয়সের ছেলে-বুড়ো, মহিলাও আছে কয়েকজন, এরই মধ্যে একটা মোবাইল ঘিরে গোল হয়ে আছে কয়েকজন যুবক ও আধবুড়ো। জিভে কেউ কেউ নানা বিচিত্র শব্দ করছে। নীলছবি চলছে। একজন আরেকজনকে ব্লুটুথে মালটা সেন্ড করতে বলছে।

যত জঞ্জাল তত ডাস্টবিন নেই! জঞ্জাল-আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে চারপাশ। প্রায়ই মনে হয় হেঁটে যাচ্ছি আবর্জনার ঘেরা দিয়ে নিজেও আবর্জনা ছড়াতে ছড়াতে!

অভিজাতদের দিন শেষ! ভদ্রলোকেরা ক্রমশই বিরল প্রজাতি। বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য এর নানারকম গুরুগম্ভীর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-ট্যাখ্যা দিচ্ছেন, কিন্তু আমি অতশত বুঝি না, শুধু দেখছি জঞ্জালে ভরে উঠছে চারদিক। এত জঞ্জাল এত জঞ্জাল যে কোথাও আর আলাদা করে ডাস্টবিন পাওয়া যাচ্ছে না!

যা কিছু ভদ্র-সভ্য বলে জানা ছিল সব নাকি মধ্যবিত্ত ভণ্ডামি-ন্যাকামি! এজন্য রবি ঠাকুরের আর কিছু জানুক না-জানুক ওর যে মহিলাঘটিত দোষ ছিল সেটা সকলেই জেনে গেছে। সে-সব নিয়ে বই লেখা হচ্ছে, হু হু করে বিক্রি, এত এত বিক্রি প্রকাশক দাঁতমাজা-হাগামোতা-খাওয়া-ঘুমের সময় পাচ্ছে না।

দেশনেতারা— বড় নেতা-ছোট নেতা-হাফ নেতা-ফুল নেতা জনসভায় বা কর্মীসভায় বা সাংবাদিকদের সামনে চমৎকার ভাষায় কথা বলছেন, ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে দেব রেপ করে চলে যাবে কিংবা পুলিশকে বোম মারুন কিংবা চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে লাইফ হেইল করে দেব ইত্যাদি ইত্যাদি। হাততালিও পড়ছে প্রচুর।

কলেজ পড়ুয়াদের একাংশ আগেও মদগাঁজা খেত, তবু একটু আড়াল-আবডাল ছিল, এখন ওসবের বালাই নেই, বিশেষ কোনও দিনও লাগে না। বরং বিশেষ বিশেষ দিনে, পঁচিশে ডিসেম্বর কি একত্রিশে ডিসেম্বর, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো, বিশ্বকর্মা পুজো ইত্যাদি ইত্যাদি দিনে চেনা এলাকাতেও স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের প্রকাশ্যে রাস্তায় মদ্যপানের ধুম দেখে গা ছমছম করে! নিজের পেটে দু-পেগ থাকলেও নেশা উড়ে যায়! আর সঙ্গে কোনও মহিলা থাকলে তো রীতিমতো বুক ধুকপুক করে!

আগে ছিল হাড়কাটা গলি, সোনাগাছি, কালীঘাট— এখন পাড়ায় পাড়ায় ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে মধুচক্র। কষ্ট করে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। নেটে গিয়ে সার্চ করে ছবি পছন্দ করে ফোনে বাড়িতে ডেকে নিলেই হল— ভরপুর মস্তি! মুক্ত বাজারে মুক্ত যৌনতা।

খেলার মাঠ থেকে পুকুর ডোবা সব ঢেকে যাচ্ছে কংক্রিটের আবর্জনায়। প্রোমোটারদের লালসা থেকে এমন কি স্কুলবাড়িও বাদ যাচ্ছে না। বাড়ি দখল করতে বৃদ্ধা মা-কে পেটাতে পেটাতে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে ছেলেবৌমা। নদীনালা খালবিলে জলের রং কালো, হাওয়ায় ভাসছে পচাগন্ধ, থিকথিক করছে পোকামাকড়। বাড়ছে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া, সব ডাস্টবিন হয়ে যাচ্ছে।

গঙ্গার পাড়ে মাঝে মাঝে যাই। বাবুঘাট-চাঁদপাল ঘাট থেকে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলি প্রিন্সেপঘাটের দিকে। ভালো লাগে, সুন্দর সাজানো গোছানো পার্ক। গাছপালা, যত্নে ছাঁটা ঘাস, সুদৃশ্য রেলিং, সিমেন্ট বাঁধানো কাঠের চেয়ার। কিন্তু ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামলে চারপাশে আর তাকানো যায় না। কত রকমের আবর্জনা। আর জলের রং? সেও কেমন ঘোলা ঘোলা, তাই আর জলে হাত-পা ডুবিয়ে মা গঙ্গার আশীর্বাদ নেওয়া হয় না।

সেদিন সবে সন্ধে নেমেছে। ত্রিফলা আলোয় মায়াবী হয়ে উঠেছে গঙ্গাপাড়ের পার্ক, গুনগুন করে গাইছিলাম –

বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের

হাহাকার শুনে নিঃশব্দে নীরবে

ও গঙ্গা তুমি, ও গঙ্গা বইছ কেন?

কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, বইছি কোথায়? মরে গেছি তো!

চমকে ঘুরে তাকালাম, না কেউ না! এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে দেখলাম একটু দূরে গাছের নীচে সিমেন্টের বেদিতে আধশোয়া হয়ে আছে এক নারী। কী মনে হল, এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখলাম এক বৃদ্ধা, ময়লা সাদা শাড়ি, কুঁচকে যাওয়া চামড়ায় কাদার ছোপ, চোখ বোজা, ঠোঁট অল্প ফাঁক হয়ে আছে। অসুস্থ কী? কী করব? চলে যাব নাকি লোকজন ডেকে—  এসব ভাবতে ভাবতেই উনি চোখ খুললেন, আমি একটু ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে শুয়ে কেন? শরীর খারাপ? থাকেন কোথায়?

হঠাৎ দমকা হাওয়া ছুটে এল, সঙ্গে ধুলো, হাত দিয়ে চোখ-নাক-মুখ আড়াল করে একটু সুস্থির হয়ে ফের তাকাতেই দেখলাম, সেই বৃদ্ধা হেঁটে চলেছেন, পার্কের রেলিঙের উপর উঠলেন, তারপর সোজা ঝাঁপ মারলেন, আর পাখি হয়ে উড়তে উড়তে গঙ্গার বুকে মিলিয়ে গেলেন।

গঙ্গা— এদেশের সবচেয়ে বড় ডাস্টবিন। যেখানে প্রতিদিন মিশছে কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ, জীবজন্তুর পচাগলা মৃতদেহ, অসংখ্য নদী-খাল-বিল থেকে বয়ে আসা আবর্জনা, মানুষ সহ নানা জীবজন্তুর মলমূত্র, আরও কত কী!

কাজী নজরুল লিখেছিলেন— ভাগীরথীর ধারার মতো সুধার সাগর পড়ুক মরে— সে সুধার সাগর এখন বিষের সাগর! গঙ্গাও আজ এত আবর্জনা বইতে পারছে না! আবর্জনা আর ডাস্টবিন একাকার হয়ে যাচ্ছে!

সব ডাস্টবিন হয়ে যাচ্ছে! সব ডাস্টবিন হয়ে যাচ্ছে!

সমাপ্ত

Spread the love
প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়– “ আস্তাকুঁড় ”
সুদীপ দাস-এর দুটি কবিতা
Close My Cart
Close Wishlist
Recently Viewed Close

Close
Navigation
Categories

Add address