বিপ্লব মাজী – “ সম্পর্কের বীজগণিত ”

Spread the love

বিভাগঃ মুক্তগদ্য
Biplab Majee

শিল্পীঃ শান্তনু গাইন

আভিধানিক অর্থে সম্পর্ক বলতে আমরা বুঝি রক্তের সম্পর্কে বাঁধা বা জন্মসূত্রে আত্মীয়তাকে। বিয়ে সূত্রেও যে আত্মীয় তাকেও সম্পর্ক বলি। এই সম্পর্কের মূলবীজ বা প্রাথমিক পরিকাঠামো পরিবার। মানব সভ্যতায় পরিবারের উৎপত্তি না হলে, কোন গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ তৈরি হত না, সমাজ তৈরি হওয়া মানেই তা একটা সিস্টেমে বাঁধা, সিস্টেমের প্রথা, রীতিনীতি নিয়ম কেউ যদি না মানে সম্পর্ক তৈরি হয় না। আর সম্পর্ক তৈরি না হলে, পরিবারও তৈরি হত না। পরিবার তৈরি না হলে কোন সমাজ ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রও তৈরি হত না। সম্পর্কের প্রাথমিক ইউনিট হল পরিবার। সামাজিক-নৃতত্ত্ব বা নৃতত্ত্বের চোখে আমরা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির দিকে তাকাই, তাদের প্রথা, রীতিনীতি ও পরিকাঠামো নিয়ে আলোচনা করি, বিভিন্ন জাতি, উপজাতি বা জনজাতির সংস্কৃতির নির্মাণে সম্পর্কের ভূমিকা বিরাট। আত্মীয়তার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের একটা সিস্টেম। এমন অনেক সমাজ আছে যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি কোন না কোন ভাবে সমগ্র সমাজের সঙ্গে নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা। আবার এমন সমাজও আছে, যেখানে আত্মীয়তার সম্পর্ক কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ —  যাদের রক্তের সম্পর্কে নিকট আত্মীয় বলা হয়। কিন্তু প্রতিটি সমাজেই আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত সেই সেই সমাজের সংস্কৃতি স্বীকৃত।

কিন্তু কোন একটি পরিবার, বা তাদের আত্মীয় স্বজন, রক্তের সম্পর্ক দিয়েই তো একটা সমগ্র সমাজের নানা পরিবার, নানা জাতের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হতে পারে না। পরিবারের বাইরেও, জীবনের নানা ক্ষেত্রে, মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরি হয়। যেমন পারিবারিক সম্পর্ক ছাড়াও, পরিবারে পরিবারে পাড়াতুতো সম্পর্ক তৈরি হয়, নানা বৈচিত্র্যের কাজের ক্ষেত্রেও সম্পর্ক তৈরি হয়—  যেমন অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সাইবার ক্যাম্পাসে। অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, সামাজিক বা সরকারি বা রাজনৈতিক নানা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। জনজাতির আইডেনটিটি নির্মাণ, বর্ণভেদ ও সাম্প্রদায়িকতার ক্ষেত্রে। এরকম আরো অসংখ্য পরিসরেও মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরি হয়, যেখানে কাজ বা জাতিগত সত্তার সম্পর্ক থাকলেও, রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। অবশ্য সংস্কৃতির বিরাট ভূমিকা আছে।

প্রাচীন গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজে সম্ভব হলেও, আধুনিক সমাজে কোন মানুষ একমাত্রিক সম্পর্ক বা আইডেনটিটি নিয়ে বাঁচতে পারে না। আধুনিক মানুষ মাত্রেই বহুমাত্রিক। যে কোন নাগরিক ও সভ্য সমাজে বহুমাত্রিক পরিচয় বা সম্পর্ক নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। আধুনিক সমাজে একমাত্রিক সম্পর্ক বা আইডেনটিটি নিয়ে বেঁচে থাকে অন্ধ মৌলবাদীরা। বহুমাত্রিক সম্পর্কের বহুস্বর তাদের দু’চোখের বিষ। বহুমাত্রিক সম্পর্ক কখনই মানুষে মানুষে দাঙ্গা বা লড়াই বাধায় না, মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তোলে না। বহুমাত্রিক সম্পর্কের জোরেই মানব সভ্যতা প্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে। যদিও যে কোন সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্ক জটিল, কিন্তু গতিশীল। গতিশীল না হলে, সম্পর্ক পাথরে রূপান্তরিত হত। সম্পর্কে রক্ত-মাংসের স্পন্দন থাকত না। সমাজ নৃ-বিজ্ঞানী ম্যলিনাউস্কি সম্পর্কের এই জটিলতাকে ‘সম্পর্কের বীজগণিত’ বলেছেন। অর্থাৎ, এক একটি সমাজের সম্পর্কের সূত্রগুলি জানতে হবে। সূত্র ছাড়া সেই সামাজিক সম্পর্কের জ্যামিতিটি জানা যাবে না।

আধুনিক বা উত্তর আধুনিক সমাজ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্কের কোন ভূমিকা না থাকলেও, ছোট ছোট সমাজের ক্ষেত্রে, আজও সম্পর্কের ভূমিকা বিরাট। বিশেষত রক্তের বন্ধন (বিয়ে) বা আত্মীয়তার ক্ষেত্রে। ছোট ছোট সমাজে ব্যক্তিকে নিজের গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের একজন সক্রিয় সদস্য হিশেবে বেঁচে থাকতে হয়। গোষ্ঠীর মিত্ররা তার মিত্র, গোষ্ঠীর শত্রুরা তার শত্রু। এইসব ছোট ছোট সমাজ তাদের নিজস্ব আইনকানুন, প্রথা, রীতিনীতি মেনে চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় রাষ্ট্রীয় আইনের গুরুত্ব তাদের কাছে নেই। রাষ্ট্র তাদের কাছে অ্যাবসার্ড ব্যাপার, সমাজ ও সমাজের বিধিনিয়ম বড়। যা আমরা আজও দেখতে পাই হরিয়ানা বা উত্তরপ্রদেশের ‘খাপ্ পঞ্চায়েত’ ব্যবস্থার মধ্যে, বা ‘মুসলিম পার্সোনাল-ল’-র মধ্যে। এইসব ছোট ছোট সমাজে কে কার সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক তৈরি করতে পারবে, কে কার আত্মীয় হতে পারবে, কে কাকে মানবে, কে কাকে মানবে না, সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কে হবে? কে হবে না, সবই আত্মীয়তার সম্পর্কের সূত্রে বাঁধা। যদিও এই সম্পর্ক শিথিল হয়ে যায়, পরিবারটি বা সমাজের মানুষটি যখন আধুনিক নগর সভ্যতার কেন্দ্রে বা কোন শিল্পনগরীতে এসে বসবাস শুরু করেন।

ছোট ছোট মাপের সমাজে সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই সমস্ত মানব সমাজ, যারা প্রযুক্তির সহজ সরল জীবন যাপনে এখনো অভ্যস্ত, তাদের কাছে বায়োলজিক্যাল বা জৈবিক সম্পর্ক এখনই তৈরি করা সম্ভব—  যখন সামাজিক সম্পর্কের নিরিখে কোন ব্যক্তি কোন নারী বা পুরুষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে মিলিত হতে পারে। সমাজে তার পরিচয়-ই রক্তের বন্ধন তৈরির অনুমতি দেয়। সর্বত্রই, ছেলে বা মেয়ে নারীর গর্ভে জন্ম নেয়। তারপর বাবা-মা সন্তান সন্ততির সম্পর্কের সূত্রে প্রতিপালন করে। একই বংশের পিতা পিতামহ থেকে শুরু করে যে শাখা-প্রশাখা বা বংশলতিকা বিস্তার লাভ করে তাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্কই প্রধান হয়ে ওঠে। বাবা, কাকা বা জেঠার ছেলেমেয়ে, সেইসব ছেলেমেয়ের ছেলে মেয়ে, এভাবে যে বংশলতিকা তাদের পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য কিন্তু ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। লিঙ্গ ও বয়সের পার্থক্য ছাড়াও, যে রক্তের সম্পর্ক ছড়িয়ে পড়ে তারাও সামাজিক গুরুত্ব আছে।

মানুষের মতো পশুদের মধ্যেও, জৈবিক সম্পর্ক আছে। কিন্তু মানুষে মানুষে সম্পর্কটা সচেতনভাবে মানব সমাজ নির্ণীত। আমাদের অনেক সম্পর্ক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গড়ে ওঠে। অর্থনীতি মানুষে মানুষে সম্পর্কের যে উঁচু-নিচু স্তর (যেমন বর্ণভেদ প্রথা) নির্মাণ করে, রাজনীতি ক্ষমতার জোরে সেটাকে স্থায়িত্ব দেয়, এবং সমাজের সবাইকে মেনে নিতে বাধ্য করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক আমাদের সেই সম্পর্কের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানের কথা বলে না। ফলে আত্মীয়তার সম্পর্ক কোন বিশেষ সামাজিক সম্পর্ক না, যেমনটি অর্থনৈতিক বা আইনি সম্পর্ক। আমরা নানা সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেই বাস করি।

কোন সমাজে বায়োলজিকাল সম্পর্কের সীমানা নির্দিষ্ট। সামাজিক সম্পর্কের সীমা সীমাহীন। অবশ্য বায়োলজিকাল সম্পর্কের নিরিখে আমরা কোন জনজাতি বা উপজাতির সম্পর্কের নানা নৃতাত্ত্বিক উপাদান পাই। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে যা কাজে লাগে। কোন জনজাতি বা উপজাতির সংস্কৃতি, আচার ব্যবহার, রীতিনীতি বুঝতে সাহায্য করে। বংশগত ও সামাজিক সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে। অবশ্য আত্মীয়তার সম্পর্ক কখনই ধ্রুবক না, তা পরিবর্তিত হতে পারে। ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনপ্রণালী, মূল্যবোধ, ব্যবহারের ওপরও আত্মীয়তার বা সম্পর্কের পরিচয় নির্ভর করে। ‘ভাই’ শব্দটার বিবিধাংশ থাকতে পারে। যে কোন সমাজে সম্পর্কের ওপর সংস্কৃতির এক বিরাট ভূমিকা আছে।

আমাদের সামাজিক সর্বত্রই সম্পর্কের বিরাট ভূমিকার কথা কেউই অস্বীকার করতে পারি না। সমাজে সম্পর্ক ব্যক্তির মর্যাদার স্থান যেমন নির্ধারণ করে, সামাজিক গ্রুপ-ও নির্ধারণ করে এবং উত্তরাধিকার। যে কোন সমাজে কোন ব্যক্তি যখন মারা যান, কিছু না কিছু উত্তরাধিকার রেখে যান—  ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে, ভাবাদর্শগত, পারিবারিক বা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হতে পারে। জমি-জমা, টাকা-পয়সা, স্থাবর সম্পত্তি। তাঁর মৃত্যুর পর এসবের উত্তরাধিকারী কে হবে? তা মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের অন্যান্যদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ভর করে। সম্পর্কের নিরিখে সমাজ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে আইনত তার সবকিছু উত্তরাধিকারী হিশেবে কে বা কারা কারা পাবে? ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও আমরা দেখি, রাজনৈতিক সম্পর্কের জোরে এক নেতা বা নেত্রীর মৃত্যু হলে, তার কাছের জন তাঁর উত্তরাধিকারী হন এবং তা ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই সম্ভব হয়ে ওঠে। কিছু কিছু ছোট মাপের সমাজ ছাড়া, পৃথিবীর সর্বত্রই সম্পর্ক রেখাটি পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের রেখা ধরে চলে। মাতৃতান্ত্রিক সম্পর্কের আধিপত্য কিছু কিছু জনজাতি সমাজে টিকে আছে।

পোস্টমডার্ন সমাজে, যেখানে নগরসভ্যতা ক্রমশ গ্রামাঞ্চলকে গ্রাস করে আকাশে মাথা তুলছে, সেখানে হাইরাইজ সংস্কৃতি ও কর্পোরেট সংস্কৃতি সম্পর্কের নতুন জটিল বীজগণিত তৈরি করছে। বায়োলজিক্যাল সম্পর্কের সীমারেখা মুছে দিচ্ছে ডায়াস্পোরা সংস্কৃতি। সামাজিক বর্ণভেদ প্রথার স্তরবিন্যাস গ্রামাঞ্চলে আজও থাকলেও, কর্পোরেট সংস্কৃতিতে সম্পর্ক নির্ধারিত হচ্ছে অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে। নগর সভ্যতার হোমানলে বায়োলজিক্যাল বা রক্তের সম্পর্কের কোন মুল্য নেই। যে কোন সম্পর্ক নির্ধারণ করবে লিবারল অর্থনীতি ও মুক্তবাজার।

সমাপ্ত

Spread the love
দয়াময় মাহান্তী – “ সম্পর্ক ”
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী – “ ঠাণ্ডা কি শীত ”
Close My Cart
Close Wishlist
Recently Viewed Close

Close
Navigation
Categories

Add address