জহর সেনমজুমদার – “ গদ্য কবিতা”

Spread the love

বিভাগঃ কবিতা

বাবা

আমাদের জীর্ণ শীর্ণ ভিটে ছাড়া আর কি আছে তুমি বলো; দাঙ্গায় নিহত বাবা মাঝে মাঝে কালো অন্ধকারের ভেতরে এসে দাঁড়ায়; মা রান্না করতে করতে করতে পিছু না ফিরেই বলে – তোর বাবা এসেছে; পা নেই, তবু এসেছে; হাত নেই, তবু এসেছে; আমরা চোখ বড়ো বড়ো কোরেও দেখতে পাইনা; ছুটতে ছুটতে নদী পাড়ে যাই; মনে হয়, নদীর ওপর, জলের মাঝখানে, কেউ যেন বসে রয়েছে; পা নেই, বসে রয়েছে; হাত নেই, বসে রয়েছে… অস্পষ্ট, আবছা… অস্পষ্ট, আবছা…

মা

Untitled-4

শিল্পীঃ বিজয় দাস

আমাদের ইসকুল গাছতলায়; কালবৈশাখির ঝড় উঠলে ছেঁড়া ছেঁড়া বইখাতা উড়ে চলে যায়; মাস্টারও গালে হাত দিয়ে শুধু চুপ কোরে বসে থাকে; মাটিতে নুইয়ে আসা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে আমরাও বোকার মতো হাত দিয়ে ঝড় ধরবার চেষ্টা করি; হাত দিয়ে কি সত্যিই ঝড় ধরা যায়? কালবৈশাখীর ঝড় উঠলে মা খুব ভয় পায়; এই বুঝি খুঁটি ভেঙে চালা উড়ে যাবে; আমরা সবাই মাকে জড়িয়ে ধরি; তারপর গোঙাতে গোঙাতে বলি, মা মা, চিন্তা কোরোনা, এই দেখো, আমরা মুঠোর ভেতর ঝড়টাকে ধরে ফেলেছি, ও আর কিচ্ছু করতে পারবেনা; মা কিচ্ছু বলেনা; শুধু ভাঙা ঢেঁকির ওপর ভেঙে পড়া কলা গাছটাকে অবাক হয়ে দেখতে থাকে… দেখতেই থাকে… কলাগাছটা কি আর কখনো উঠে দাঁড়াবে না? আমরাও ভাবতে থাকি; শুধু ভাবতেই থাকি…

দিদি

গাছ তলার ইসকুলে প্রায়ই দেখাতাম, মাস্টার দিদিকে ডাঁশা পেয়ারা দিচ্ছে, আমাদের নয়; আমরা চাইলেও কখনো একটাও পেয়ারা পেতাম না; মা মাস্টারকে পছন্দ করতো না; একদিন বঁটি নিয়ে তাড়া করতেই মাস্টার জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে পড়লো; গাছতলার ইসকুল উঠে গেলো; কিছুদিন পর, কাউকে কিছু না বোলে, দিদিও জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেলো – আর বেরোলো না; দিন আর রাত্রি, রাত্রি আর দিন, আমরা শুধু জঙ্গলের চারিপাশে ঘুরি, আর উদ্ভ্রান্তের মতো চেয়ে থাকি জঙ্গল চেরা সরু পথটির দিকে; একটাও ডাঁশা পেয়ারা গড়িয়ে আসেনা; মাস্টার আর দিদি কি ওই জঙ্গলের ভেতরেই আছে? ডাঁশা পেয়ারা খাচ্ছে? জানিনা জানিনা; এরপর আমরা আর কিচ্ছু জানিনা…

পরিবারতন্ত্র

বাবা ভালোবাসে বকুলগাছ মা ভালোবাসে জবাগাছ দিদি ভালোবাসে টগরগাছ; আমাদের গ্রামে এই তিনটি গাছই নিজেদের মতো কোরে যথাস্থানে আছে; দাঙ্গায় বাবা নিহত হবার পর, দেখতাম, মা কেমন উদাস চোখে বকুল গাছের দিকে তাকিয়ে আছে; জঙ্গলে দিদি চলে যাবার পর, দেখতাম, মা বারবার টগরগাছের খুব কাছে গিয়ে বিড়বিড় কোরে কী যেন বলছে; জোনাকি ভর্তি সন্ধেবেলা, মাঝে মাঝে, মা ফিসফিস কোরে আমায় বলতো, একটা বকুল এনে দিবি? একটা টগর এনে দিবি? মা ভালোবাসে জবাগাছ; কিন্তু জবাগাছের দিকে মা আর ফিরেও তাকায়না; জোনাকি ভর্তি সন্ধেবেলা, জবাগাছ থেকে শুধু একটি জবা, টুপ কোরে মাটিতে খসে পড়ে; কোথাও কিচ্ছু হয়না – এছাড়া কোথাও কিচ্ছু হয়না; শুধু একটা মনখারাপ আমাদের গ্রাম থেকে ক্রমশ নদীর দিকে চলে যায়…

ধন্যবাদ

Spread the love
পিয়ালী বসু – “ বহু প্রতীক্ষিত জীবনবাদ ”
অমিত চক্রবর্তী – “ সম্পর্ক ”
Close My Cart
Close Wishlist
Recently Viewed Close

Close
Navigation
Categories

Add address