সায়ন চক্রবর্তী – “ বহুরূপী ”

বিভাগঃ রম্যরচনা


cartoon
ত্রিপুরেশ্বরী দেবী মহারাজ রোহিতমাণিক্যের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। প্রায় প্রতাপাদিত্যের মত বিস্ময়ে রোহিতমাণিক্য তাকিয়ে রইলেন দেবীর দিকে। দেশের উত্তর পূর্ব আর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে প্রায় গেরুয়া বিকেল যখন নামছে, তখন উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে গা ভরা গোবর ও গোমূত্র মেখে উঠে দাঁড়াল নমোসংকীর্তনের দল। লাফিয়ে পড়ে তারা তাদের প্রায় এক পুরুষ পুরনো রথে উঠতে যাচ্ছে, এমন সময় সোনা ঝনঝনিয়ে, হীরের দ্যুতিতে রাতকে দিন করে এসে দাঁড়ালেন অমৃতবাণী শ্রেষ্ঠী। দলপ্রধান গৈরিকেন্দ্রকে ডেকে বললেন, “যাচ্ছ কোথায়?”
“কোথায় আবার, দখল নিতে। রোহিত বংশের পতন হয়েছে তো।”
“হবেনা। যুগ বদলে গেছে। এই এক গা গোবর আর গোচোনা দেখলে লোকে হেসে মরে যাবে। নতুন জামা পরো। এই দ্যাখো, ডিজিটাল লেখা কোট এনেছি।”
“এটা কি ? খায় না মাথায় দেয়?”
অমৃতবাণী মাথা নেড়ে বললেন, “হল না। তোমার আর হল না। সভাকবি?”
কৃশকায় সভাকবি মাথা চুলকে বললেন, “বলুন।”
“হয়েছে রচনা?”
মাথা চুলকে সভাকবি পড়তে শুরু করলেন, “আমদানি হোক আর রপ্তানি / সবেতেই জেতে অমৃতবাণী -”
“চোপ। এটা নয়, ডিজিটাল মন্ত্রটা-”
“ও হ্যাঁ হ্যাঁ, দাঁড়ান পড়ছি-”
“ বাকি রাখা ধারদেনা
মোটে ভাল লাগছেনা।
হাজার ধরতে করব জেদ,
কোটি গেলে নাই খেদ।
ভরপেট নাও খাই,
ডিজিটাল বলা চাই।
বোকা ভক্ত মহান
নমো নমো নমো ভগবান।”
কপালে তিলক, এক হাতে তরোয়াল, গলার পাউচে গোচনা আর ডান হাতে একটা নতুন মোবাইল নিয়ে নমোসংকীর্তনের দল রথ ফেলে রেখে গাড়িতে চড়ে বেরোল। সেই ধুলোর ভিতরে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে অমৃতবাণী বললেন, “পাশ্চাত্য অবধি সুড়ঙ্গ পথ তৈরী তো?”
অনুগামীরা বলল, “বললে আজ রাতেই বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে-”
“না না। আভি তো আউর আচ্ছে-”
সভাকবি বললেন, “চুপ চুপ। এসব বললেই আজকাল গায়ে গেরুয়া লেবেল সেঁটে দিচ্ছে।”
অমৃতবাণী বললেন , “ কারেণ্ট অ্যাফেয়ারস নিয়ে ঐ রবীন্দ্রসঙ্গীতটা চালাও তো-”
“কোনটা? আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়?”
“আঃ, কমন ম্যান অ্যাংগলটা না- অন্যটা-”
সভাকবি মোবাইলে ‘তুমি রবে নীরবে’ বাজিয়ে দিল।

উত্তর পশ্চিমে যখন হর হর রামদেব বলে নমোসংকীর্তনের দল বীরদর্পে এগিয়ে আসছে, তখন শস্যশ্যামলা, চাইলেই মেলা বঙ্গে জঙ্গলের মধ্যে থেকে একটা বাচ্চার পরিত্রাহি কান্না শোনা যাচ্ছে। তার সঙ্গে মাঝে মাঝে একটা দুটো চড়চাপড়ের আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে। কাছে যেতে দেখা গেল ফটকট করে হাওয়াই চটি পরে একজন মহিলা একটা বাচ্চাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে।
“চোপ। এক চড় মারব। বলেছিলাম বাড়ি বসে ছোটা ভীম দ্যাখ, আমার শিল্পীরা তোকে সকাল বিকেল চপ ভেজে দেবে, তা না। মহাভারতের আমলের তীরধনুক নিয়ে রোহিতমাণিক্যের দেশে লড়তে গেছে। বেশ হয়েছে মার খেয়েছিস, তোকে পাস্তা বানিয়ে তোর মায়ের কাছে নাস্তায় পাঠিয়ে দিতে পারত হতভাগা।”
“খুব মেরেছে, একটা যুদ্ধও জিতিনি। ওরা আমাকে বলেছে, ‘আগে ছিল হাত। এখন হয়েছে অজুহাত’।”
“ঠিক বলেছে। একটা ওম্যানকে বিয়ে করলি না, সারাক্ষণ শুধু ওম্যান এম্পাওয়ারমেন্ট। বিয়ে করলে বুঝতিস ওম্যানরা এমনিই কত পাওয়ারফুল।”, বলে মহিলা বাচ্চাটার কান মলে দিল।
কানে হাত বোলাতে বোলাতে বাচ্চাটা বলল, “আমার কান লাল করে-”
এমন সময় একটা বাঘের ডাক শোনা গেল। গর্জন নয় গোঙানি। রোর নয় গ্রাউল(আপনি একাই সত্যজিৎ রায় পড়েননি, হুঁ;!)
বাচ্চাটা বলল, “দিদি, বাঘ।”, বলে কেঁদে ফেলল।
একেবারে আদর্শ অরণ্যে রোদন। দিদি আঁচলের খুঁট থেকে খানিকটা মুড়িমাখা বার করে গালে ফেলে বলল, “ছিল। এটা তো রোহিতমাণিক্যের জ্ঞাতিভাই রে। কয়েক পুরুষ আগে শিকার করা ছেড়ে দিয়েছে। এখন শুধু চালকলা খায় আর “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম” গায়। এই গানটা থেকে মনে পড়ল একটা ‘বাউল উৎসব করব’।”
“আছে তো বোধহয়।”, বলল বাচ্চাটা।
“তাহলে সুন্দর উৎসব। ব্যস।”
“মানেটা কি?”, বলল বাচ্চাটা, “সব উৎসবই তো সুন্দর।”
“তুই কি আরেকটা কানও লাল করতে চাস?”
এইসময় বুড়ো বাঘটা আবার ডুকরে কেঁদে উঠল। দিদি বলল, “ ও বাবা বৃদ্ধদেব। কি হল আজ? লাল শুনলেই ডুকরে উঠছ কেন?”
“রোহিত, আমার রোহিত। আহা কি ট্যালেণ্টেড ছেলে-”
বাচ্চাটা বলল, “রোহিত শর্মার কথা বলছেন বুঝি?”
বাঘটা কান্না থামিয়ে বাচ্চাটার দিকে চেয়ে বলল, “নেহাত অহিংস হয়ে বুদ্ধ হয়েছি, নইলে তোকে পার্টি সংবিধান চাপা দিয়ে মেরে ফেলতাম।”
দিদি বলল, “আর বলে কি হবে? তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে তোমার, একটা বৃদ্ধশ্রী নেবে?”
বাঘটা বলল, “ঐ নমোসংকীর্তনের দল-, একবার বাগে পেলে-”
বাচ্চাটা বলল, “আরে আপনি তো বাঘ। চাইলেই ওদের মারতে পারেন। মারছেন না কেন?”
বাঘটা পুরো হতভম্ব হয়ে গেল। কয়েকবার খাবি খেল, তারপর টেনেটুনে একটা চশমা বার করে, একটা লালশালুতে মোড়া পাঁজি নিয়ে, একটা গাছের ডাল থাবায় ধরে বলল, “ব্যাপারট সোজা না।”, বলে মাটির ওপর ডাল দিয়ে একট দাগ কেটে বলল, “এই মনে কর আমি।”, একটু পরে আবার একটা দাগ কেটে বলল, “এই মনে করো নমোসংকীর্তনের দল”, আবার একটা দাগ কেটে বলল, “এই মনে করো পার্টি করাত, যে করাত দিয়ে পার্টি কাটে”, আবার কিছুক্ষণ পরে একটা দাগ কেটে বলল, “এই মনে কর পাঁজিটা, এবার দেখতে হবে দু’শো বছুরের পুরনো পাঁজিতে কোন দেশে কখনো এমন লগ্ন এসেছে কিনা-”
“দুত্তোর”, বলে বাচ্চাটা ওখান থেকে সরে এল, এসে দিদিকে বলল, “কেমন একখানা প্রশ্ন করেছি বল তো?”
দিদি মুচকি হেসে বলল, “ওরম মনে হয়। শোন বিকেলে তোর মাকে একবার আসতে বলিস তো। দুটো ঢপের চপ ভেজে দেব। আর কথাও আছে।”

তামাম ভারতবাসী এই নক্সা দেখতে গঙ্গার পারে বসেছিল। রহিম রামের থেকে সিগারেটের কাউণ্টার নিতে গিয়ে থেমে গেল, কি জানি কাল কি হবে। বহু শতাব্দীর ধুলো উড়িয়ে আকাশে দৈববাণী শোনা গেল,
“সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ!”

সমাপ্ত
“সম্পাদকের কথা” – তৃতীয় বর্ষ ।। প্রথম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪২৫
সূর্যাশীষ পাল – “ অভিমন্যু ”
Close My Cart
Close Wishlist
Recently Viewed Close

Close
Navigation
Categories

Add address