সূর্যাশীষ পাল – “ অভিমন্যু ”

বিভাগঃ ছোটগল্প

প্রথম অধ্যায়

illustration1

শিল্পীঃ সুদীপ চক্রবর্তী


আর কোনো উপায় ছিল না অভিমন্যুর কাছে। অভিমন্যু মানে অভিমন্যু হালদার। কলকাতার নামকরা মনোচিকিৎসক। মানুষ কতটা বিকৃত হতে পারে সেটা তিনি জানেন। অতএব কাওকে সহজে বিশ্বাস তিনি করেননা। তাই বোধ হয় বন্ধু , বান্ধব , আত্মীয়, সজ্জন নেই বললেই চলে। বিয়ে করেছেন। ছেলে মেয়ে হয়নি। মিথ্যে সংখ্যাবৃদ্ধি করে কোন লাভ নেই , ছেলে পুলে হলে টাকা পয়সার শ্রাদ্ধ হবে। এতো আগেকার জামানা নয়। এখন ছেলে মেয়েরা বাপের পয়সায় ফুর্তি করে। আর বাপ্ বুড়ো হলে লাথি মারে।

বিয়েটাও তিনি অনেক লেট করেছেন। ছোকরা বয়েসে বান্ধবী টান্ধবী ছিল। কিন্তু চল্লিশের ঘরে যখনি পা দিলেন , তখনি বুঝলেন যে সে সব আর কপালে জুটবে না। হঠাৎ এক দিন তার ইন্টার্ন সৌমিলির প্রেমে পড়বার ভান করলেন। সৌমিলিও ভান করলো। বিয়ে করে নিলেন। কিছুদিন একাকিত্ব কাটল। সৌমিলি কিন্তু মিডলাইফ ক্রাইসিসের মোক্ষম ওষুধ।

রাত্রি অনেক ঘনিয়ে এসেছে। অভিমন্যু সাধারণত এই সময় ঘুমিয়ে যায়। শীতের মৌসুমে লেপের মুড়ি তার ভীষণ প্রিয়। কিন্তু আজ তার মন ছুটে যাচ্ছে সেই দিনে। বছর তিনেক আগে অধীরথি সরকার ঢুকেছিলো তার হাসপাতালে। গৌরবর্ণ , দীর্ঘকায় , চোখে মুখে একটা বুদ্ধির ছাপ। সৌমিলির সাথে বন্ধুত্বও পাতিয়ে ফেললো ছেলেটি। আসলে সৌমিলি একদম সেকেলে নয় , অভিমন্যুর জীবনে অসংখ্য মেয়ে এসেছে গেছে। সৌমিলি এই অবাধ আনাগোনার হিসেব রাখেনি। তা ছাড়া অধীরথি আর সৌমিলির মধ্যে বন্ধুত্বের বিস্তার কতদূর ছড়িয়েছে সে তো নিজেও জানেনা। তাই এব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে জল ঘোলা করা যায়না।

কিন্তু ঈর্ষার আগুন যে জ্বলে উঠেছে। সেই ঈর্ষার আগুনে ঘি ঢালছে সন্দেহ। অধীরথির গৌরবর্ণ চেহারা , দীর্ঘকায় দেহ সব যেন হিংসের ইন্ধন। নাহ, বেপারটা তাকে জানতেই হবে। ডিটেক্টিভ , টিকটিকি ,খোঁচরের এ কাজ নয়। মিছিমিছি অর্থ ব্যয় , এবং লোকজানাজানি | তাকেই কিছু করতে হবে। ঠিক তখনি মনে পড়েছিল ফ্রান্সের স্ট্রাসবোর্গ শহরের সেই ওয়ার্কশপের কথা। তখন অভিমন্যু ফ্রান্সেই তার পোস্ট গ্রাডুয়েশন কমপ্লিট করছিল, মনঃচিকিৎসক অভিমন্যু হালদারের জন্ম হয়নি। সাইকোটিক হিপ্নোটিজমের ওপর ওয়ার্কশপ , কলেজেই হচ্ছিলো বলে এটেন্ড করেছিল। সাইকোটিক হিপ্নোটিজমের মূল সিদ্ধান্ত হলো ট্রান্সফার অফ কোন্সসিয়াসনেস। যিনি হিপ্নোসিস করেন , তিনি নিজের কোন্সসিয়াসনেস অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন। যিনি হিপ্নোসিস করেন তার শরীর থেকে চেতনা লোপ পায় , কিন্তু অবচেতন মনে রয়ে যায়। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় যেন তিনি গভীর নিদ্রায় মগ্ন , কিন্তু আসলে তার চেতন মন কোন অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করেছে। তার শরীর সব অনুভূতিই এই নতুন চেতনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

সাইকোটিক হিপ্নোসিসের পদ্ধতি খুব একটা কঠিন নয়। মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে , তখন সে সব থেকে দুর্বল। তার চেতন মন তখন নিষ্ক্রিয় , কিন্তু তার অবচেতন মন সব কিছু শুনতে পারে , বুঝতে পারে। সেই সময় মানুষের কানে ফিসফিস করে হিপনোটিক আফিরমেশন বলতে থাকলে তার চেতন মনে প্রবেশ করা যায়। নিজের শরীর তখন আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কাজ শেষ হয়ে গেলে নিজের শরীর মধ্যে একই রকম ভাবে ফিরে যাওয়া যায়।

দ্বিতীয় অধ্যায়
অসংখ্য বার , অসংখ্য রোগীর সাথে এই হিপ্নোটিজমের খেলা খেলেছিলেন। রোগীর জীবনের অজানা তথ্য , কালো সত্য না জানলে কি আর প্রপার ট্রিটমেন্ট হয়। কিন্তু সেদিন বেপারটা অন্যরকম ছিল , মানুষের সম্মতি ছাড়া হিপ্নোসিস করা উনএথিক্যাল। ডাক্তারি পেশার সাথে বেয়াদবি। কিন্তু তাকে যে ইটা জানতেই হবে। তার ব্লাড প্রেসার বেড়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে তার একবার হার্ট স্ট্রোক হয়েছে। সৌমিলির বেপারে সব কিছু না জানলে যে তিনি মারা যাবেন।

সেদিন শনিবার। সৌমিলির ছুটি , রাত্রে বেলায় বন্ধুদের সঙ্গে বেরোবে। এই অজুহাত দিয়ে বেরোয় , তার পর চলে যায় সে অধীরথির কাছে। পুরোটা অনুমান , কিন্তু কিছু অনুমানের প্রমান লাগেনা। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো অভিমন্যু কিছুক্ষন। বিছানায় ঘুমিয়ে , শান্ত চেহারা। এটাই কারেক্ট টাইমিং , যা ভাবা তাই করা। পারফেক্ট এক্সেকিউশন।

আজ দু দিন হল অভিমন্যু সৌমিলির শরীরে। না কিছুই সন্দেহ জনক লাগেনি। ইতিমধ্যে তিনবার দেখা হয়েছে অধীরথির সাথে। কিন্তু সে অভিমন্যুর অনুপস্থিতে প্রেম নিবেদন রাখেনি। সে তো বলেছে জয়িতার কথা। জয়িতার সঙ্গে তার খুব অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। জয়িতা মেডিকেলটা পাশ করলেই তারা বিয়ে করবে। শুধু শুধু সন্দেহ করেছিল অভিমন্যু তার ভাবতেও লজ্জা করে। না এবার ফিরে যেতে হবে নিজের দেহে।

নিজের দেহটি সোফায় পড়ে আছে। ঠিক যেমন ছেড়ে এসেছিলেন। ঘুমন্ত অবস্থায় , কানে কানে ফিসফিস করে কিছু আফিরমেশন দিলেই জেগে উঠবে। নিজের দেহের কানের কাছে হাটু গেড়ে বসলো সৌমিলির দেহে অধিষ্টিত অভিমন্যু। আফিরমেশন ফিসফিস করতে লাগলো। সময় একটু বেশি লাগছে , সে লাগতেই পারে। কিন্তু অভিমন্যুর দেহ বিন্দুমাত্র রেস্পন্ড করছেনা। অভিমন্যু দেহটার হাতটা ধরল। হাতটা এতো ঠান্ডা কেন। অভিমন্যু নাকের কাছে হাত নিয়ে গেল। না এ হতে পারেনা। আরেকবার ভালো করে দেখেনিল , না এবার আশঙ্কা নেই। অভিমন্যুর দেহের মৃত্যু ঘটেছে। সে আর কোনোদিন ফিরে যেতে পারবেনা। সৌমিলির নারী শরীর সেদিন যেন চক্রব্যূহ।

সমাপ্ত
সায়ন চক্রবর্তী – “ বহুরূপী ”
বিজয়দান দেথা – “ অধিকার ”
Close My Cart
Close Wishlist

Close
Navigation
Categories

Add address

India