“ জেনারল অব দি ডেড আর্মি ” – ইসমাইল কাদারে

Spread the love

“ মৃতাংশের খোঁজে ” – বিজয় দাস

বিভাগঃ আলোচনা

Bijay Das

“Look, I have brought them back. The going was rough, and the weather was on our backs all the way”

সোভিয়েত কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির একনিষ্ট ভাবশিষ্য হিসেবে পরিচিত ইসমাইল কাদারে, মূলত কবি হলেও আধুনিক বিশ্ব সাহিত্যে অন্যতম একজন উপন্যাস লেখক হিসেবে পরিচিত। কম্যুনিস্ট ও ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসন এবং শোষণপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা নিয়ে তার লেখা প্রথম কবিতার বই ড্রিমস১৯৫৭ সালে মস্কোয় প্রকাশিত হয়। এরপর অনেকটা সময় রাশিয়ায় কাটিয়ে ১৯৬০ সালে ফিরে আসেন স্বদেশ, আলবেনিয়ায়। ফেরার তিন বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জেনারল অব দি ডেড আর্মি’। এবং প্রকাশের সাথে সাথেই আলবেনিয়া সহ গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে উপন্যাসটি।

গ্রিসের সীমান্তবর্তী আলবেনিয়ার জেরোকাস্তায় ১৯৩৬ সালের ২৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন ইসমাইল কাদারে। জেরোকাস্তার একটি মিশন স্কুল থেকে তার লেখাপড়ার শুরু। স্কুল শেষে রাশিয়ার তিরানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও দর্শন অনুষদে ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়েন। এরপর ভর্তি হন মস্কোর গোর্কি ইনস্টিটিউট ফর ওয়ার্ল্ড লিটারেচারে। পেশায় সাংবাদিক হলেও ১৯৭০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আলবেনীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। ১৯৮১ সালে ‘দি প্যালেস অব ড্রিমসউপন্যাসে কমিউনিস্ট শাসনের ব্যাপক সমালোচনার কারণে ব্যান করা হয় বইটি। এমনকি দেশের বাইরে বই প্রকাশ এবং বিদেশ ভ্রমণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। সাহিত্যে অবদান হিসেবে রয়েছে বিখ্যাত কিছু সৃষ্টি, দ্য ওয়েডিং (১৯৬৪), দ্য ক্যাসেল (১৯৭০), ক্রোনিকল ইন স্টোন (১৯৭১), ব্রোকেন এপ্রিল (১৯৮০) ও দ্য পিরামিড (১৯৯২) ইত্যাদি। পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে ওনার লেখা। বেশ কয়েক বার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীতও হয়েছেন। এছাড়াও ১৯৯২ সালে পিক্স মন্ডিয়াল কিনো ডেল ডুকা পুরস্কার পান। ২০০৫ সালেদ্য ম্যান বুকারপুরস্কার পান। ২০০৯ সালে পান প্রিন্সেস অব অ্যাস্টুরিয়াস এ্যাওয়ার্ড। এছাড়া আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন ইসমাইল কাদারে।

লন্ডনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা তাকে গোগল, কাফকা ও অরওয়েলের সঙ্গে তুলনা করে। কবি, ঔপন্যাসিক, রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবী ইসমাইল কাদারেকে নিজের স্বাধীনতার জন্য যথেষ্ট মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ‘Literature led me to freedom, not the other way round.The great universal literature has always had a tragic relation with freedom. The Greeks renounced absolute freedom and imposed order on chaotic mythology, like a tyrant.’ উনি মনে করেন, “সত্যিকার কল্যাণ রাষ্ট্র আসলে একটি মায়া, এক স্বপ্নজাল কিংবা পারলৌকিক শান্তি স্থানের মত কাঙ্ক্ষিত- যা দেখতে হলে পার হতে হবে সেই একমুখী দরজা…”।

(১)

কাদারের প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস “দ্য জেনারল অব দি ডেড আর্মি” (১৯৬৩) ইংরাজি ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। উপন্যাসের পটভূমিতে অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন আলবেনিয়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত, আবহাওয়া ও নিসর্গ। উপন্যাসের শুরুতেই তিনি বলছেন, “Rain and Flakes of snow were falling simultaneously on the foreign soil.” উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ও কথক একজন ইতালিয় জেনারল। তাকে আলবেনিয়ায় পাঠানো হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃত ইতালিয়ান সৈনিকদের দেহাবশেষ খুঁজেতে। এই কাজে তার সঙ্গে নিযুক্ত হন একজন ধর্ম যাজক যিনি একসময় ইতালিয় সৈন্য দলের কর্নেল ছিলেন।

কাদারে অদ্ভুত ভঙ্গীতে বর্ণনা করছেন, “নীচের মাটি গহ্বর এবং এবড়ো খেবড়ো ঢাল যেখানে বৃষ্টি পড়ছে, তার তলদেশে শুয়ে আছে আমার দেশের সৈন্যরা”। প্রথম বারের জন্য দ্বিধা ও ভয়ে জেনারেলের মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। তিনি যেন উপলব্ধি করতে পারছেন, এই বিদেশে তার কাজ সহজ হবে না। চোখের সামনে দেখছেন সেই মৃত সৈন্যদল; যারা তার নিচে, বিদেশী মাটির নিচে হিমায়িত ও বিধ্বংস হয়ে শুয়ে আছে এবং তাদের এই মাটির তলা থেকে নিদ্রাভঙ্গ করার মিশনেই দায়িত্বপ্রাপ্ত তিনি। জেনারলের এই মিশনের বর্ণনায় কাদারে বলছেন, একটি মিশন যা তার গর্ভের অপ্রত্যাশিত ফলাফল বহন করে।

(২)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে কুড়ি বছর আগে। এই কুড়ি বছর ধরে হাজার হাজার মা অপেক্ষা করছে তাদের সন্তানের ঘরে ফেরার। দীর্ঘ অপেক্ষার ফলস্বরূপ অনেকেই স্মৃতির পাতায় ঝাপসা। আজ হয়তো তাদের সন্তানেরা জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবেনা কিন্তু তাদের অবশিষ্ট দেহাবশেষ নিজের হাতে মাতৃভূমির ক্রোড়ে ফিরিয়ে দিতে পারলে হয়তো তাদের মনে এক শান্তির প্রলেপ পড়বে। উপন্যাসিক কাদারে কখনও কবি কাদারে হয়ে উঠে কাব্যিক ভঙ্গীতে বলছেন, “Like a proud and solitary bird, you will fly over those silent and tragic mountains in order to wrest our poor young men from their jagged, rocky grip.”

প্রথম কবরের সামনে দাঁড়িয়ে জেনারল লক্ষ্য করছেন টুকরো, গুড়ো গুড়ো মাটিতে তার পা ঢেকে যাচ্ছে, হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে তার কণা। তিনি নিজেকে বলছেন, এই সেই বিদেশী মাটি। কালো কাদা, পাথর, মাটি সবই তো আমার দেশের মতই, Earth like earth everywhere। তবুও এটা বিদেশ।

“কিছু দূরে আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু পড়ে আছে, অর্ধেকটা শরীর জলে, দুই হাতদিয়ে বেল্ট ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগলাম। হঠাৎ সে ফিস ফিস করে বলে উঠলো, আমি যদি মরে যাই এবং সেই সময় যদি তুমি আমার সাথে থাকো, দয়া করে যতটা গভীর গর্ত করা যায় তত গভীরে আমাকে কবর দেবে। কারণ আমি ওই কুকুর আর শেয়াল গুলোকে খুব ভয় পাই, ওরা যদি আমার শরীরের গন্ধ পায়……! উত্তরে বলেছিলাম, কোন চিন্তা কোরো না, তোমার কবর অনেক, অনেক গভীর হবে। ওরা তোমায় খুঁজে পাবে না…। এবং আমি আমার কথা রেখেছি”। মর্মান্তিকতার এমনি কিছু উদাহরণ কাদারে তুলেধরেছেন সাধারণ ভঙ্গীতে। আলবেনীয় সরকার নিয়োজিত একজন বিশেষজ্ঞ এবং চারজন শ্রমিক জেনারলের সহযোগিতায় নিযুক্ত হয়। প্রথম সমাধিক্ষেত্রে বহু প্রতীক্ষার পর মাটির গভীর থেকে বের করে আনা হয় প্রথম সৈন্যের দেহাবশেষ, যেখানে এখনও তার বুক অলংকৃত করছে তার দেশের সৈনিক পদক ‘ভার্জিন মেরী’।

ক্লান্ত, বিষণ্ণ জেনারল তার দল নিয়ে কুড়ি দিন বাদে ফিরে আসেন তিরানার হোটেল দ্যাজতিতে। হোটেলের বাইরে পাইন গাছের সারি, বেসমেন্ট থেকে ভেসে আসছে মৃদু সঙ্গীত। জেনারল ব্র্যান্ডির গ্লাস নিয়ে অন্ধকার লাউঞ্জে এসে বসলেন। নেশাতুর চোখে প্রথম পরিভ্রমণের স্মৃতি ক্ষত বিক্ষত হয়ে উঠতে লাগল। “It tears at my heart when I think of them. I feel like a foster father trying to make it up to children that others have abandoned”।

অনেক রাতে তিনি নিজের ঘরে চেয়ারে বসে আরাম করে সিগারেট ধরায়। এত ক্লান্তির পরেও একটুও ঘুম নেই চোখে। ব্রিফকেসটা খুলে মৃত সৈন্যের তালিকাটি উঠিয়ে নিলেন, যা তার বহু বার পড়া, আবার পড়তে শুরু করলেন। মৃত সৈন্যের নাম, উচ্চতা, সৈন্য দল, এছাড়াও অন্যান্য বিবরণ সহ দশ পাতার এক সম্পূর্ণ বিবরণী। যেখানে সৈন্যদলের তালিকায় রয়েছে “ওল্ড গ্লোরি রেজিমেন্ট”, “সেকেন্ড ডিভিশন”, “আয়রন ডিভিশন”, “ ৩-য় অ্যালপাইন ব্যাটালিয়ন”, “ ৪-র্থ রেজিমেন্ট অব গার্ডস”, “ভিক্টরি ডিভিশন”, “৭-ম ইনফ্যানট্রি ডিভিশন”, এবং “ব্লু ব্যাটালিয়ন”। এই তালিকার প্রথম নাম কর্নেল জি। কাদারে উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই চরিত্রটিকে অদ্ভুত এক রহস্যের অন্তরালে রেখেছেন। মৃতের তালিকায় কর্নেল জি নাম থাকলেও তার মৃত্যুর কোন প্রত্যক্ষদর্শী নেই, কেউ যেমন তাকে মরতে দেখেনি তেমনি তার জীবন্ত থাকারও কোনও প্রমাণ নেই। ফলে তার মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত হয়েছে এক গাঢ় রহস্য। জেনারল চেয়ার ছেড়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লেন, কিন্তু ঘুম আসছে না। মাথার মধ্যে কয়েকশ ড্রাম একসাথে বাজছে আর তার তালে ওঠানামা করছে বুক। তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ঘরের অন্ধকারাচ্ছন্ন লাইটের দিকে। মনে পড়ল এমনি এক ঘুম ভাঙা রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লোকটির কথা, সেও ছিল একজন ইতালিয় সৈনিক, আলবেনিয়ায় যুদ্ধ চলাকালীন সে তার এক প্রিয় বন্ধুকে ফেলে এসেছে বিদেশের মাটিতে; যাকে খোঁজার আর্তি নিয়েই তার আসা।

এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন কারও বৃদ্ধ মা-বাবা, কারও স্ত্রী, কারও ছেলে-মেয়ে, কারও ভাই, কারও বন্ধু একই আর্তি নিয়ে জমায়েত হত তার বাড়ির সামনে। জেনারল ধৈর্য নিয়ে প্রত্যেকের বক্তব্য শুনতেন, এবং সমস্ত দরকারি নথি লিখে নিতেন। আলবেনিয়া আসার শেষ সপ্তাহে দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেল। প্রত্যেকে একই আর্জি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতো তার জন্য। কিন্তু এত ভিড়ের মধ্যেও তিনি দেখতেন একজন বৃদ্ধা প্রতিদিন আসেন কিন্তু কিছু না বলেই চলে যান, জেনারল একদিন তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ছেলে, একমাত্র ছেলে, সে এখনও ওখানে আছে। কাপা কাপা হাতে তিনি তার ছোট্ট ব্যাগ থেকে একটা হলদেটে পুরানো টেলিগ্রাম বের করে জেনারলের হাতে দিলেন, তাতে লেখা, “. . . fell on the field of battle at Stalingrad”। এবং জেনারল যখন তাকে জানায় জায়গাটি রাশিয়ায় তখন বৃদ্ধার মুখ হতাশায় ম্লান হয়ে ওঠে। অবশেষে বলেন, “There is something I want to ask you to do.” “Could you manage to find out where he died, and how? And who was with him, who brought him water, and what his last wishes were?”

(৩)

উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জেনারলকে বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হতে দেখা যায়। তার মধ্যে সবসময় এক দ্বিস্তরীয় স্বত্বা ফুটে ওঠে। জেনারল যখনই একা তখনই তার এই দুই স্বত্বার মধ্যে শুরু হয় ডুয়েল। আবেগ, ভয়, হিংসা, ক্রোধ এই সব ব্যাপারেই দুই স্বত্বার লড়াইয়ের মাঝে জেনারল বন্দী। কাদারে তার উপন্যাসে জেনারেল চরিত্রটিকে কখনও নায়ক, কখনও খলনায়ক আবার কখনও সাধারণ এক মানুষের ভূমিকায় প্রতিস্থাপন করলেও আশ্চর্য এক ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। যেখানে প্রতিটি অবস্থা সহজেই চোখে পড়ে, কিন্তু প্রত্যেকটি যে একটিই চরিত্র সেটা বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না।

আলবেনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের সমাধিক্ষেত্র, একেরপর এক পিছিয়ে পড়া গ্রাম-মফস্বল, ট্রাকের পিছনে ধুলোয় ঢাকা মৃত সৈন্যদের দেহাবশেষ; জেনারল এগিয়ে চলেছেন তার দেশের শহীদ সৈন্যের মৃতাংশের খোঁজে। তাদের এই খোঁজ সহজ হয়নি, কখনও ভুল তথ্যের কারণে কখনও কালের নিয়মে, কখনও গ্রামবাসীদের কুসংস্কার, বিদ্রোহ কখনও বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। আবার মৃত শরীরের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শ্রমিকের দল। উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো আবির্ভাব হয় আরেক সমস্যা, জার্মানি দেশের লেফ্টেনন্ট জেনারল। মৃত দেহাবশেষ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাটানিও চোখে পড়ে উপন্যাসের মধ্যে। এত রকমের প্রতিকূলতার মধ্যেও জেনারল খুঁজে চলেছেন তার মৃত সৈন্য দল।

কাদারে এই উপন্যাসে আলবেনিয়ার প্রাচীন গ্রামগুলির যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন। গল্পের ভঙ্গিতে দেখানো হয়েছে সংস্কারযুক্ত গ্রামগুলি রহারিয়ে ফেলা স্বাভাবিক ছন্দ, বিদেশি সৈন্যদলের উৎপীড়ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আবার গ্রামের মাঝে হঠাৎ বেশ্যালয় স্থাপন। সবশেষে নিজের স্বামী, পুত্র আঁকড়ে গ্রাম্য মহিলাদের টিকে থাকার লড়াই। উপন্যাসটির আখ্যান যত এগিয়েছে পাল্টে যাচ্ছে চরিত্রগুলি। কোনও এক গ্রাম স্মৃতি বহন করছে ইতালির “ব্লু ব্যাটালিয়ন” সৈন্য দলের। এখানেই এই পুরো দলটিকে তাদের দুর্গের মধ্যে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। স্মৃতি স্বরূপ একটি পাথরে লেখা, “ Here passed the infamous Blue Battalion that burned and massacred this village, killed our women and children, and hanged our men from these poles. To the memory of its dead the people of this place have raised this monument.”

পাহাড়ের অলিগলি পথ আগলে এক বৃদ্ধ অপেক্ষা করছেন জেনারলের পথ চেয়ে, জেনারলের গাড়ি তাকে দেখে থামল। বৃদ্ধ একটি কফিন নিয়ে বসে আছেন, তিনি জানান এটি এক ইতালিয় সৈন্যের মৃতদেহ। এই বেচারা ছেলেটিকে জেনারলের হাতে তুলে দিতেই তার আসা। কারণ, হয়ত ওর জন্য ওর মা বহু অপেক্ষায় বসে আছেন। সৈন্যের পরিচয় জানতে চাইলে বৃদ্ধ বলেন, “We all just called him ‘Soldier’.” দেহাবশেষের সাথে জেনারলের হাতে আসে একটি ডাইরি। এখানেই শুরু হয় অসাধারণ এক গল্প।

“Everyone here calls me ‘Soldier’.” সবাই আমাকে এই নামেই ডাকত, মিলের মালিক, তার স্ত্রী ‘Aunt Frosa’ এবং ক্রিস্টিন্ তাদের একমাত্র মেয়ে। সেই দিন যখন বিপক্ষ সেনা আমাদের হামলা করল, আমার বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে ঠেলে দিল ওই ভয়ঙ্কর জঙ্গলের মধ্যে, ভয়ে পালাতে লাগলাম, দৌড়তে দৌড়তে কখন যেন আবিষ্কার করলাম একটি কিশোরী আলবেনীয় মেয়ে চীৎকার করে বলছে, “Papa! There’s a soldier comming here!” এবং এই ভাবেই একজন সৈনিক থেকে আজ মিলের কর্মচারী। হয়ত আমার পরিবার, বন্ধু এবং সহযোদ্ধারা ভাবছে আমি মৃত…!

Bijay Das2

শিল্পীঃ সুদীপ চক্রবর্তী

এই পরিবারের সাথে থাকতে থাকতে কবে যেন এদেরই একজন হয়ে গেলাম। ওরা আমার ভাষা বোঝে না, আমিও বুঝি খুবই অল্প তবুও ওদের সাথে এক আত্মিক অনুভূতি তৈরি হয়েছে। বিশেষত ক্রিস্টিন্; যখনই ও সামনে আসে আমার শূন্য হৃদয় উতলা হয়ে ওঠে। ওর সুন্দর সুরেলা মিঠেল স্বর আমাকে রোমাঞ্চিত করে। হঠাৎ আমি অনেক পায়ের আওয়াজ আর চীৎকার শুনতে পেলাম, দেখলাম একদল সৈন্য। আমি জানিনা,  না পালিয়ে আমিও ভিড়ে গেলাম ওদের দলে, ওরা চীৎকার করে উঠল, “Burn it down, men!” ওরা মিলের দুইজনের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিল, মিলের মালিককে বাইরে উঠানের সামনে এনে গুলি করল, আর আন্ট ফ্রোজ্যাকে ওরা হাত পা বেঁধে টানতে টানতে বের করতে লাগল, সে আমার মুখে থুতু ছুঁড়ে দিয়ে চীৎকার করে উঠল, “ Filth! Spy!” কিন্তু আমি কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে পাগলের মতো খুঁজে চলেছি ক্রিস্টিনকে। আমি ছুটে গেলাম ওর শোয়ার ঘরে, একটানে ছিঁড়ে ফেললাম পাতলা রাতের পোশাকটা, ও কম্পিত কণ্ঠে চীৎকার করে উঠল, “No! Soldier! No!” উফ্! ভাগ্যিস এটা শুধু মাত্র একটা দুঃস্বপ্ন ছিল! এখন আগস্টের সন্ধ্যে, গত রবিবার ক্রিস্টিনের বিয়ে হয়ে গেল। তার ঠিক দুইদিন আগে আমি ক্রিস্টিনকে আমার পদকটি, ভার্জিন মেরী উপহার দেই, যা আমার পরিচয় বহন করে। এখন আমি মুক্ত।

আজ ৫ই সেপ্টেম্বর গাছের পাতাগুলো হলদে হতে শুরু করেছে, সকালের পরিষ্কার আকাশে অনেক অনেক উঁচু দিয়ে কয়েকশো যুদ্ধ বিমান উড়ে গেল উত্তর-পশ্চিম দিকে। কি জানি আজ পৃথিবীর কোন প্রান্তে এরা বোমা বৃষ্টি করবে !”এখানেই শেষ হয় এই পলাতক সৈনিকের গল্প। সৈন্যের কফিন জেনারলের হাতে তুলে দিয়ে বৃদ্ধ লোকটি কান্না চাপা গলায় বলে উঠলেন, “No one ever thought to ask him what his name was. Farewell. God be with you on your journey.”

সৈনিকদের মৃত দেহাবশেষের সাথে স্মৃতির ভার বহন করে চলেছে এমনি বহু ডাইরি।

একের পর এক সমাধিক্ষেত্র, গ্রাম, শহর, হাজার হাজার গল্প, ট্রাকের পিছনে রাখা মৃত সৈন্যের ভিড় জেনারলের মানসিক অবস্থা করে তুলছে দুঃসহ। “The general ordered brandy and lit a cigarette. A bottle of brandy was brought to him. He filled his glass and drank. The contours of the Albanian earth began an obsessive dance before his eyes, and above them, the rows of graves.” নেশাতুর গলায় চীৎকার করে ওঠেন, “আমি এখন মৃত সৈন্য দলের সেনাপতি। কিন্তু উর্দির জায়গায় তাদের পোশাক নাইলনের ব্যাগ”।

এখানেই কাদারে প্রতিস্থাপন করেছেন উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র। ধর্মযাজক অথবা প্রাক্তন ইতালিয় কর্নেল, চরিত্রটিকে সহনশীল এবং শুভবুদ্ধি সম্পন্ন একব্যাক্তির রূপ দিয়েছেন এই উপন্যাসে। উপন্যাসে সবসময়ই তাকে দেখা যায় জেনারলের সাথে কথোপকথনে অথবা জেনারলকে অনুপ্রাণিত করতে।

(৪)

“এই বিদেশের মাটিতে আবার বসন্ত ফিরে এল। ঘাস গুলো আবার বড়ো হচ্ছে, কিছু দিনের মধ্যেই পুরো পৃথিবী ঢেকে ফেলবে, পড়ে থাকবে শুধু পায়ে চলা সরু পথ”। জেনারলের মিশন প্রায় শেষ। তবু এখনও তালিকার শীর্ষে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছেন “Colonel Z”।

উপন্যাসের একটি অংশে দেখা যাচ্ছে একটি বাড়ির বারান্দায় মুখোমুখি বসে আছেন দু’জনে, জেনারল ও প্রাক্তন কর্নেল। এত দিনের সফরের স্মৃতি, শেষ বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি হাতড়ে চলেছেন ক্রমাগত। “Like a tragic and lonely bird . . .” বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, বৃষ্টির শব্দের সাথে ভেসে আসছে অচেনা গানের সুর। দূরে কোথাও বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। গানটা হয়ত সেখান থেকেই আসছে। হঠাৎই জেনারল খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন অনুষ্ঠান বাড়ির উদ্দেশ্যে। তাদের উপস্থিতিতে এক আতঙ্ক সঞ্চারিত হল আমন্ত্রিতদের মধ্যে। গান থেমে গেল। বাড়ির মালিক তাদের একটি চেয়ারে বসতে সাহায্য করলেন এবং এক পাত্র হুইস্কি এগিয়ে দিলেন। সবাই চুপ। নেশায় মত্ত জেনারল ফিস ফিস করে কর্নেলকে জানালেন সবাই তাদের খুব সম্মান করছে। উত্তরে কর্নেল বললেন, “Death Commands respect everywhere.”

অবশেষে শেষ দিনটি উপস্থিত। মেঘাচ্ছন্ন অলস একটা দিন। দুপুরে হোটেলে প্রেস কনফারেন্স, সকাল থেকেই সাংবাদিকদের ভিড়। মৃত সৈনিকদের আত্মার শান্তি কামানায় আয়োজিত হয়েছে এক অনুষ্ঠান। কিন্তু জেনারল তখনও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠেননি, তিনি যেন শুনতে পাচ্ছেন, “Rain and death, it’s everywhere. A battle between dead men!” তিনি দেখতে পাচ্ছেন, তার মৃতের সৈন্যদল মার্চ করতে করতে এগিয়ে চলেছে।

“Rain mixed with snow was falling on the foreign soil.”

(৫)

“দ্য জেনারল অব দি ডেড আর্মি” ইসমাইল কাদারের প্রথম ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। আলবেনিয়া দেশের সৌন্দর্য, দারিদ্রতা, হিংসাত্বক রাজনীতির সুন্দর বর্ণনা করেছেন একজন শিল্পীর মতন। প্রতিটি চরিত্র সৃষ্টিতেও তিনি রেখেছেন সহজাত স্পর্শ। পরবর্তী কালে তার এই উপন্যাসকে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে অনেক সিনেমা, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য লুসিআনো তোভোলি পরিচালিত ইতালিয় সিনেমা “ Il generale dell’armata morta” । দ্য টাইমস বইটি সম্পর্কে লিখেছে, “Literary gold dust – haunting, bleakly comedic and ultimately horrific.” দ্য নিউইয়র্ক টাইমস কাদারে সম্পর্কে বলেছে, “Mr. Kadare doesn’t do messages; he brings them to lethal life. A peasant gives voice to the dark current that the expedition releases. To bring out the remains of the Italian invaders and their Albanian collaborators is to reinforce the enemy, he complains. Dead soldiers are soldiers.” কাদারে তার এই উপন্যাসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিভ্রম, রাষ্ট্রক্ষমতা ও একনায়কতন্ত্রের এক নিষ্ঠুর বাস্তব সত্য তুলে ধরেছেন। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন, মাতৃভূমির জন্য শহিদ সৈন্যদের মৃতদেহ তার নিজের দেশে ফিরিয়ে আনতে কুড়ি বছরেরও বেশি সময় লাগে, কারণ রাজনৈতিক নেতারা ব্যাস্ত সৈন্যদের জীবন নিয়ে রাজনীতি করতে।

সমাপ্ত

Spread the love
ঋক কুণ্ডু – “ বিসর্জিত দুর্গা ”
মুহাম্মাদ সারোওয়ারে জুলফিকার (ঢাকা, বাংলাদেশ) – “ তিনআত্তা ”
Close My Cart
Close Wishlist
Recently Viewed Close

Close
Navigation
Categories

Add address