অর্ণব মণ্ডল – “ বাহার-এ-আরব ”

১৭ই ডিসেম্বর, ২০১০ সালে টিউনিশিয়ার এক পুলিশ আধিকারিক বিনা অনুমতিতে ব্যবসা করার জন্য রাস্তার এক ফল বিক্রেতা মহম্মদ বোয়াজিজি ( Mohamed Bouazizi )-র দোকান বাজেয়াপ্ত করে, একইসাথে একজন মহিলা পুলিশ তাকে অপমানিত করে জনসমক্ষে থাপ্পড় মারেন। অপমানিত বোয়াজিজি এই অন্যায়ের বিচারের জন্য স্থানীয় গভর্নর দপ্তরে অভিযোগ জানাতে গেলে সেখানকার কোনও কর্মীই তার একটি কথাও শুনতে চায়নি। সেই অসহায় ফলবিক্রেতা অফিস থেকে বেরিয়ে তার সামনেই জনসমক্ষে নিজেকে জ্বালিয়ে দেন—  এই একটি ঘটনা গোটা টিউনিশিয়া দেশে এক গণআন্দোলনের সূচনা করে, ইতিহাসে যা ‘জেসমিন্ বিপ্লব’ পরিচয় পেয়েছে। এই আন্দোলন বেন্ আলির দীর্ঘ ২৩ বছরের একনায়কতন্ত্রের সমাপ্তি এনে দেয়। এই বিপ্লব মধ্যপূর্ব ও উত্তর আফ্রিকা (MENA)-র দেশ লিবিয়া-আলজিরিয়া-মিশর-মরক্কো-সিরিয়াতে জনগণের মধ্যে এক সরকার বিরোধী আন্দোলন ও সশস্ত্র বিপ্লবের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

আন্দোলনের উদ্দেশ্য একটাই ‘একনায়কতন্ত্রকে গণতন্ত্রের রূপ দেওয়া’—  যা মোটেই সহজ ছিলনা। এজন্য প্রয়োজন ছিল দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার সচেতনতা গড়ে তোলা, যার অভাব MENA-র দেশগুলোর পূর্বেই ছিল। MENA-তে বহু গণআন্দোলন মাথাচাড়া দিলেও তারা ছিল দুর্বল এবং মোটেই একজোট ছিল না—  এই একটি কারণের জন্যই আন্দোলন অনেকটা প্রদেশ জুড়ে বিস্তার করা সত্ত্বেও সর্বত্র সফলতা পায়নি। লিবিয়ার স্বৈরাচারী শাসক গদ্দাফিকে হত্যা করতে আমেরিকা সহযোগিতা করার পরও সেখানকার মানুষদের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের দ্বিগুণ মাপের দেশ সিরিয়া, অত্যন্ত ছোট, দরিদ্র ও জনবহুল। যার অধিকাংশটাই মরুভূমি। বৃষ্টির হার স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও ২০০৬ থেকে ২০১০ সুদীর্ঘ চারবছর সিরিয়াবাসী খরার সাথে সংঘর্ষ করছে। চারবছরের অভিশাপ আটলক্ষ চাষির জীবিকা ছিনিয়ে নেয়, দুলক্ষ সাধারণ মানুষকে ছিন্নমূল করে দেয়। কৃষিজমি বন্ধ্যা হয়ে ওঠে, গৃহপালিত পশুরা খিদা তৃষ্ণায় বেঘোরে প্রাণহারায়। বাঁচার তাগিদে মানুষেরা শহরে এসে ভিড় জমাতে শুরু করে। এই ভিড়ে সামিল হয় আরও পঞ্চাশ হাজার ইরাকী এবং একলক্ষ প্যালেস্তানী। ইরাক তখন আমেরিকার সাথে যুদ্ধ করছে আর ইজরায়েল তাদের পবিত্রভূমি দখল করতে সকল প্যালেস্তানীদের উৎখাত করতে ব্যাস্ত। প্যালেস্তানী মানুষেরা গোলান হাইটস (Golan Heights) টপকে দক্ষিণ পশ্চিম দিক দিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করে এবং ইরাকীরা পূর্বের কাঁটাতার পেরিয়ে সিরিয়ায় শরণার্থী হয়ে যায়।

হাজার হাজার চাষি এসে থিতিয়ে পড়ল শহরের রাস্তায়। প্রত্যেকের চোখে ভয়, ক্রোধ, নিঃস্ব হওয়ার বেদনা, যা ক্রমশই বারুদ হয়ে জমতে শুরু করেছিল। বারুদে স্ফুলিঙ্গ পায় ১৫ই মার্চ ২০১১ তে, সেদিন দক্ষিণ পশ্চিমের শহর দাররা-তে (Daraa) কিছু মানুষ জমায়েত করে সরকারের কর্তব্য জ্ঞানহীনতার জবাবদিহি চাইছিল, সরকার সেই জমায়েত কঠোর হাতে দমন করতে উদ্যত হলে তার আগুন শহর থেকে শহরোত্তর হয়ে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং খুব কম সময়ের মধ্যে বিদ্রোহের আকার নেয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে বহু সরকারী প্রশাসনিক আধিকারিক লজ্জায়, ঘৃণায় পদত্যাগ করে এবং সরকার বিরোধী দল Free Syrian Army (FSA)-র গঠন করেন।

ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের মাপের দেশের ভিতর বর্তমানে প্রায় একহাজার বিদ্রোহী সৈন্যদল ও লক্ষাধিক সৈন্য সক্রিয় আছে, যা অত্যন্ত আশ্চর্যের। সিরিয়ার সরকার বাকি দেশের সরকারের সাথে উনিশে বিশে মিলে যায় কিন্তু বিপ্লবীরা কাদের সাথে মেলে তা শনাক্ত করা দিনের পর দিন মুশকিল হয়ে উঠছে। বিপ্লবী সংগঠনের মধ্যে প্রধান হল ‘জাবাত্-আল-নুসরা’ যারা ইসলাম ধর্মকে স্বীয় মর্যাদায় স্থাপন করতে চায়, আবু-বাকর আল বাগদাদির ISIL বা ISIS বা দাইস (Daesh) যা পরে IS হয়ে যায়। যাদের উদ্দেশ্য খলিফাতন্ত্রকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া, তাছাড়াও কুর্দ উপজাতিরা লড়াই করছিল তাদের জন্য আলাদা দেশ ‘রোজারা’ গঠনের দাবীতে।

সিরিয়ার শাসন ব্যবস্থা বর্তমানে Ba’ah Party-র নেতা বাসার-আল-আসাদ এর অধীনা। দেশের আশি শতাংশেরও বেশি মানুষ সুন্নি মুসলমান অথচ আসাদ একজন সিয়া, আলাওয়াইট্ মুসলিম, এই ব্যবস্থায় বহু মানুষ আপত্তি জানায়। তাদের অভিযোগ যে, আসাদ নিজে সিয়া তাই সকল সুযোগ সুবিধা সিয়াদের দেওয়া হয় আর তাই তারা আসাদকে নিজেদের রাষ্ট্রপতি মানতে নারাজ। কিছু পুরানো বিদ্রোহী সংগঠন সংখ্যালঘু আলউইস (Alawis) মুসলিমদের গণহত্যার হুমকি দেয়। ব্রিটিশ সাংবাদিক জনাথন স্টীলি খবরে দেখান কিছু বিদ্রোহীরা এতটাই পাশবিক হয়ে গেছে যে তারা শিশুর কাটা মাথা ও নারীর উলঙ্গ দেহকে আপাদমস্তক দু’ফালা চিরে পাশাপাশি দু’টো আপেল গাছে ঝুলিয়ে রাখে।

২১শে আগস্ট, ২০১৩-র মধ্যরাতে রাজধানী শহর দামাসকাসের পূর্বভাগের ঘোটা (Ghouta)-য় বিদ্রোহীদের অধিকৃত বেশকিছু অঞ্চলে ৮ থেকে ১২ টা রাসায়নিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এই ঘটনার তিনদিনের মধ্যেই প্রায় ২৭০ জন স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যু হয়। সেদিন ভোররাতেই ঘোটার অপর অংশে আবারও রাসায়নিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এই ঘটনা রাষ্ট্রপুঞ্জ অত্যন্ত ঘৃণার চোখে তিরস্কার করে। সে বছরই রাশিয়ার পরামর্শে আসাদের অনুমতিতে OPCW (Organization for the Prohibition of Chemical Weapon) সমস্ত বিষাক্ত রাসায়নিক-এর সংগ্রহকে বিনষ্ট করে দেয়। OPCW-র এরকম জনহিতকারী কাজের জন্য ২০১৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দ্বারা সংস্থাটিকে উৎসাহিত করেন নোবেল কমিটির সদস্যরা।

এরপরও ২০১৪ সালে ISIS প্রায় ১৪০ জন কুর্দিশ বাচ্চাদের অপহরণ করে জোড় করে গোঁড়া মুসলিম-এর শিক্ষা দিতে শুরু করে। সেবছর জুন মাসেই ISIS নিজেদের IS বলে ঘোষণা করে। নভেম্বরেই IS সিরিয়ার ৩২২ জন সুন্নি উপজাতির মানুষকে প্রাণদণ্ড দেয়। ধীরে ধীরে IS তার প্রকোপ ছড়াতে থাকে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে।

৪ঠা আগস্ট ২০১৭-র রাতে ইদলির প্রদেশের খান শেখহুম (Khan Sheikhoun) শহরের বছর চোদ্দর মেয়ে, মারিয়াম আবু খলিল তখনও জেগেছিল, হঠাৎ একটি যুদ্ধবিমান এসে তার এলাকার একটি একতলা বাড়ির ছাদে বোমা ফেলে। বোমার আওয়াজে ঘুমন্ত শহর মুহূর্তের মধ্যেই আর্তনাদের সাথে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। মারিয়াম খেয়াল করে বোমার ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ব্যাঙের ছাতার আকার নিতে নিতে কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মারিয়ামের চোখ জ্বলতে শুরু করে, সে আর কিছু দেখতে পায়নি।

হুসেন কায়াল, ইদলিবের এক সংবাদদাতা বোম ফাটার আওয়াজে তড়িঘড়ি সে স্থানে পৌঁছান সাহায্যের জন্য কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেখানে বোমের কোনও গন্ধ ছিল না, যা সাধারণত বোম ফাটার পর থাকে। হুসেন দেখল, বহু মানুষ রাস্তায় লুটোপুটি খাচ্ছে, কারও হাত পা বেঁকে গেছে, কারও মুখ থেকে গ্যাঁজা বেরোচ্ছে। এক মর্মান্তিক দশা হয়েছে সকলের। সে রাতের বোমায় ছিল বিষাক্ত সারিন গ্যাস। সারিন যৌগ সায়ানাইডের চেয়ে কুড়ি গুন বেশি ক্ষতিকারক ও প্রাণসংহারক।

বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে জার্মান বিজ্ঞানীরা কার্যকরী কীটনাশক আবিষ্কার করতে করতে সারিন যৌগ আবিষ্কার করে ফেলেন। যা পরে নাৎসি বাহিনী রাসায়নিক বোমা প্রস্তুতিতে ব্যবহার করে। ২০০ মিলিগ্রাম সারিন একটি মানুষকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মেরে ফেলতে পারে।  সারিন যৌগ তরল ও গ্যাসীয় দুটি ভৌত অবস্থাতেই ব্যবহার করা হয় তবে সারিন গ্যাস বেশি হানিকারক। বিশুদ্ধ সারিনকে শনাক্ত করা অসম্ভব, এটি স্বচ্ছ, বর্ণহীন, স্বাদহীন ও গন্ধহীন যৌগ। বাতাসের চেয়েও ভারী এই গ্যাস যে কোনও স্থানের বায়ুমণ্ডলে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে থিতিয়ে থাকে এবং ধীরে ধীরে ব্যাপিত হয়। সে রাতের হামলায় ৮৯ জনের মৃত্যু হয়। যাদের মধ্যে ৩৩ জন শিশু ও ১৮ জন মহিলা। আক্রান্তদের শরীর থেকে পাওয়া রক্ত ও মূত্রের নমুনায় আইসোপ্রোপাইন মিথাইলফসফোনিক অ্যাসিডের সন্ধান মিলেছে, যা কেবলমাত্র সারিন বিয়োজনেই সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। এই ঘটনা সিরিয়ার প্রশাসনের সততার ওপর প্রশ্ন রেখে দেয়, যেখানে আসাদ সরকার ২০১৩ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সমস্ত রাসায়নিক বোমকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার, তা সত্ত্বেও চার বছরের মধ্যেই তারা আবার কেন সেই বিষাক্ত সারিন প্রস্তুত করেন এবং যুদ্ধে ব্যবহার করে!

ইজরায়েল প্যালেস্টাইন দখলের কারণে হাজারে হাজারে মানুষ সিরিয়ায় পালিয়ে আসে। এর পিছনে পিছনে এক লক্ষ লেবানন্ বাসী পালিয়ে আসেন লেবানন্-ইজরায়েলের দ্বন্দ্বের কারণে। ২০ লক্ষের মতো ইরাকি সিরিয়ায় আশ্রয় নেয়, যাদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। ভৌগলিকভাবেই যুদ্ধের বহুপূর্বেই সিরিয়া নিজেই শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল। এখনও অব্ধি সিরিয়ার ২০ লক্ষ মানুষ দেশান্তরিত হয়েছেন, ৪০ লক্ষ শরণার্থী হয়েছেন এবং বাকিরা এখনও বেশ কিছু দুর্গম এলাকায় ফেঁসে রয়েছেন। বর্তমানে লেবাননের এক তৃতীয়াংশ মানুষই সিরিয়ার উদ্বাস্তু। জর্ডনের একটি শহরে শুধুই পাঁচ লক্ষ সিরিয়ার শরণার্থীর ভিড়, যা জর্ডনের পঞ্চম বৃহৎ শহরে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে অবস্থা এমন হয়েছে যে, সরকার এবং ইসলামী মৌলবাদীদের মুষ্টিযুদ্ধ প্রধান হয়ে উঠেছে MENA-র দেশগুলোতে। প্রথমের গণআন্দোলন মাঝপথে এসে দিশা হারিয়েছে। দেশগুলি বেকারত্বের হারে বিশ্ব নজির বানিয়েছে ইতিমধ্যেই। এতদিনের যুদ্ধে একথা স্পষ্ট যে, কোনও পক্ষই এর মীমাংসা চান না। দিনের পর দিন এই যুদ্ধ ক্রমশই ‘বর্বরতার সংঘর্ষ’-এ পরিণত হচ্ছে, যার ফল ভোগ করছে সেখানকার সাধারণ মানুষ। ‘আরবীয় বসন্ত’ সিরিয়াতে এসে ধীরে ধীরে ‘আরবীয় শৈত্য’-তে পরিণত হয়েছে এবং আরও ঋতু দেখার বাকি আছে আমাদের জীবদদশায়।

syria-outline-map-clipart-15

Bibliography:

  1. Unacademy.com
  2. Study IQ education
  3. BBC News
  4. CNN
  5. Aljazeera.com
  6. Wikipedia
  7. nytimes
  8. Britannica.com
  9. Theguardian.com
  10. The Hindu
  11. Theatlantic.com
  12. Theconversation.com
  13. mashable.com
  14. Journals.ametsoc.org
  15. Nasa.gov

Your Review

Please Login to Comment.