সত্যব্রত সিন্‌হা – ‘পলাশের খোঁজে : বড়ন্তি’

Spread the love

ভরা বসন্তের এই শেষ বিকেলে কোথা থেকে নষ্ট রাত্রির ঢাউস অন্ধকার ঢেকে ফেলেছে সাদা-নীল আকাশটা। দমকা হাওয়ার সোঁ সোঁ শব্দ, বিদ্যুতের ঝিলিক… আকাশের বুকে গুরু গুরু ধ্বনি, চারিদিকে কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব ড্যামের নিরালা চত্বরে, হঠাৎই অকাল সন্ধ্যায় বৃষ্টির কনর্সাট… ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি।ঢেউ খেলে যায় শাল সেগুনের বনে। মুগ্ধ বিস্ময়ে আঁচল ভরে ওঠে কানায় কানায়। নিস্তব্ধ বড়ন্তির সাথে তখন আমার কত সুখ দু:খের কথা।
বৃষ্টি থামলে ক্যানেলের ধারের নির্জন রাতপথে একাকী আমি রিসর্টের পথে, মনের মধ্যে উথাল-পাথাল…
” এমন ভাবে কেউ ডাকে না
কেউ ডাকে না এমন করে
শিখর থেকে সেগুন রেনু
বাতাস লেগে পড়ছে ঝরে
বুকের উপর মুখের উপর।”

WhatsApp Image 2020-05-06 at 9.03.30 PM

বড়ন্তি ড্যাম

রাত যত গভীর হয় নিস্তব্ধতা তত জড়িয়ে ধরে বড়ন্তিকে। সাঁওতালী গ্রাম থেকে ভেসে আসে মাদল ধামসার শব্দ। পাহাড়ের ঢালের জঙ্গল থেকে অজানা কোনো শ্বাপদের ডাক রাতের নীরবতাকে খান খান করে মিলিয়ে যায়। লজের চৌকাঠ ঘেঁষে খোলা আকাশের নীচে নিশিযাপনের এক বিলাসি নেশা আমাকে পেয়ে বসেছে। সময়ের সাথে জমাট অন্ধকার উড়ে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়, মেঘেদের আড়াল থেকে চাঁদের উকি,শুষে নিচ্ছে অন্ধকার। আরামকেদারায় শুয়ে দেখি ইচ্ছেখুশির রাত। রাত ফিকে হতে হতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি খেয়াল নেই। সকালের নরম আলোয় জেগে উঠি। দেখি অন্ধকার ভেঙে জেগে উঠেছে বড়ন্তি। নতুন আলোর উৎসাহে উদ্দামতা মহুলবনে; জ্বলে উঠেছে পলাশের দাবানল। এ দাবানলে আগুনের উত্তাপ নেই, আছে রোমান্টিকতার পরশ। ফাগুন দিনের আগুন নীল আকাশের নীচে; পলাশে-শিমুলে রঙের উদ্ভাস-সবুজের সাথে লালের ছোঁয়াছুঁয়ি। গাছের কচি পাতায় জীবনের আঘ্রান… পলাশের সাথে বাতাসের লুটোপুটি।

WhatsApp Image 2020-05-06 at 9.05.44 PM

পলাশের রঙে আবেগ বিস্ফোরণ

দিনের আলোয় ভাসছে রাঙামাটির উঠোন। রঙের খেলায় মেতে উঠেছে প্রকৃতি। পলাশের নেশায় আকন্ঠ চুর হয়ে থাকি। কুমারী প্রকৃতির সাথে পরকিয়া। লালচে চাদরে নিজেকে মুড়ে ফেলেছে বড়ন্তি। ছোট ছোট পাহাড় আর জলাধারে ঘেরা বড়ন্তি একটি ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম। আড়ে-বহরে-উচ্চতায় বেশি নয় পাহাড়গুলো। পুরুলিয়ারর রঘুনাথপুর গ্রামের সাঁতুরি ব্লকে শান্ত সবুজ বড়ন্তির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বড়ন্তি নদী। এই নদীতেই বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে জলাধার যার পোশাকি নাম রামচন্দ্রপুর জলাধার। জলাশয়ের জলে সবুজ গালিচা আর মাথার উপর নীল আকাশের ছায়া,-চোখ মন জুড়িয়ে দেয়। প্রকৃতি তার অন্তর মহলের অনাবিল ঐশ্বর্যের ডালি সাজিয়ে বসেছে। বসন্তের মাতাল সমীরণ ভাললাগার ঢেউ তোলে আবিষ্ট মনে। পড়ন্ত বিকেলে সূর্য যখন একটু একটু করে ঢলে পড়ছে পশ্চিম আকাশে, ডুব মারব মারব করছে পাহাড়ের আড়ালে হ্রদের জলে তখন রঙের ছটা মনেতে যে ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে তার দ্যুতি থেকে যায় বহুদিন। দিনশেষের এই লালচে আলোয় রক্তিম পলাশের রঙ,-আবেগ বিস্ফোরণ মাতাল মনে।

WhatsApp Image 2020-05-06 at 9.03.40 PM

গড়পঞ্চকোট

কাছেই জীবনপুর গ্রাম। ইচ্ছে থাকলে সহজেই নিতে পারেন অনাঘ্রাত সাঁওতালী জীবনের আস্বাদ। নিকোনো মাটির উঠোন, ছবি আঁকা দেওয়াল… ভাললাগার মাখামাখি। এদের প্রধান উৎসব টুসু, ভাদু,  বাঁধনা। উৎসবে মেলা বসে আর মেলার মূল জৌলস আদিবাসী নৃত্য ও সঙ্গীত। শুধু শিল্পী মন নিয়ে খুঁজে নেওয়া লোকজীবনে লোকগান, নাচ ও লোককবিতার প্রভাব।

বর্ষা কিংবা শীতেও অনায়াসে যাওয়া যেতে পারে… অনাবিল সৌন্দর্যের পসরা নিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাবে রূপসী বড়ন্তি। শীতের সকালে নরম আলোয় বাঁধের নীল জল পরিযায়ী পাখিদের কোলাহলে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। পক্ষীপ্রেমীদের এ এক স্বর্গ রাজ্য। অথবা পরন্ত বিকেলের মিঠে রোদ গায়ে মেখে জলাধারে সূর্য-ডোবার পালা… আর তারপর চাঁদ ধোওয়া এক সাঁঝবেলা…। নিঝুম প্রকৃতির বুকে বিচ্ছুরিত রূপোলী আভায় মন ডুব দেয় এক স্বর্গীয় আবেশে।

WhatsApp Image 2020-05-06 at 9.03.51 PM

জয়চণ্ডী : এখানে হীরক রাজার দেশে সিনেমায় উদয়ন পণ্ডিতের লুকিয়ে থাকার দৃশ্যটির শুটিং হয়েছিল

বর্ষায় সবুজ বড়ন্তির ভরা যৌবন। দিগন্তের সবুজ বনানী, কচি ধানক্ষেতে ঢেউ তোলা বাতাসের হিল্লোল,  নব পল্লবে বৃষ্টির সাম্য গান, বাঁধের রাস্তায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে গৃহপথে বর্ষণ সিক্ত সাঁওতালী রমণী অথবা নিরাসক্ত আকাশের নীচে জ্যোৎস্নার অমোঘ জালে নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে সে অক্লেশে দুহাত বাড়িয়ে বলে : এসো স্বাগতম, এসো – পুরুলিয়া মানে শুধু পাষান নয়, হে সখা বুকেতে তার সৌন্দর্যের অফুরান খনি, সে রত্নগর্ভা…

কাছে – দূরের দ্রষ্টব্য স্থান :
12 কিমি দূরত্বে পাঞ্চেত পাহাড়ের কোলে গড় পঞ্চকোট,-প্রকৃতি ও ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর সহাবস্থান।কালো পীচের রাস্তা চলে গেছে সবুজ বনের গহীনে। অনুচ্চ পাহাড়ের নীচে ইতস্তত অবহেলায় পড়ে রয়েছে পঞ্চকোট রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ, সমকালীন দেউল, রঘুনাথ মন্দির, সংস্কার করা পঞ্চরত্ন মন্দির, রানিমহল, গড় পঞ্চকোটের গেট। নৈ:শব্দের বুকে ইতিহাস এখানে কানে কানে গল্প বলে।
ঘুরে আসা যেতে পারে 21 কিমি দূরের হীরক রাজার দেশ খ্যাত জয়চন্ডি পাহাড়; যেখানে উদয়ন পন্ডিত লুকিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। 500 সিঁড়ি ভেঙ্গে শীর্ষে পৌঁছালে যে অপার্থিব দৃশ্য চোখে পরে তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো মূক করে দেয়।
ইচ্ছা থাকলে খুব সহজেই বেরিয়ে নেওয়া যায় বিহারীনাথ, গুটিপোকা থেকে রেশম চাষের জন্য বিখ্যাত রঘুনাথপুর, শুশুনিয়া পাহাড়, পাঞ্চেত ও মাইথন ড্যাম এবং কল্যানেশ্বরী মন্দির।

95373201_2501107010149672_2141828236928090112_n (1)

সমাপ্ত


Spread the love
বিজয় দাস – ‘ইসমাইল কাদারের সাহিত্য ভাবনা ও ‘দ্যা জেনারল অব দি ডেড আর্মি’’
বিজয় দাস – ‘ এডগার অ্যালান পো : এক অনন্য কবিতা জগৎ ’
Close My Cart
Close Wishlist
Recently Viewed Close

Close
Navigation
Categories

Add address