রাহুল দাশগুপ্ত – “ ইভান বুনিনের ‘দি ভিলেজ’ ” ৩

Untitledদুরনোভকায় আসার পর কিছুটা স্থিতি জোটে কুজমার। খুব কৌতূহলী হয়ে সে এখানকার মানুষদের লক্ষ্য করে। ডাইনি থেকে শুরু করে এমন সব মানুষ এখানে আছে, মনে হয় যারা ওল্ড টেস্টামেন্টের পাতা থেকে উঠে এসেছে। এখানে অভাব আর দারিদ্র ভয়াবহ। ঘরে ঘরে উপযুক্ত আলো, জ্বালানি আর খাদ্যের অভাব। সঙ্গে আছে বৃষ্টি, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাস আর তুষারঝড়। তার সঙ্গে বসন্ত, জ্বর, কলেরা ইত্যাদি নানা রোগব্যাধি, চিকিৎসার কোনও ব্যবস্থা ছাড়াই। নতুন শস্য তোলার পরও চাষীর ঘরে পর্যাপ্ত রুটি থাকে না। এখানে লোকে বিশ্বাস করে, জার আদ্যন্ত সোনা দিয়ে তৈরি। কিন্তু এই দারিদ্রেও কুজমার সংবেদনশীলতা অটুট থাকে। চারপাশের স্তব্ধতার ভেতর সে শুনতে পায় গাছ থেকে আপেল ঝরে পড়ছে।

     দুরনোভকায় এসেই সেরি আর তার ছেলে দেনিসকার সঙ্গে আলাপ হয় কুজমার। সেরির ঘরটা মনে হয় যেন মৃত, শীতল আর অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই অন্ধকার কুজমাকে ভারাক্রান্ত করে। রোদকার মৃত্যুর পর ইভদোকিয়া পুরোপুরি কুজমার আশ্রয়ে আসে। স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়েটির নিরুত্তাপ আচরণ সবারই বিস্ময় উদ্রেক করে। ইতিমধ্যে আরও একবার তাকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করা হয়, কিছু বাইরের লোক আপেল বাগানে এই চেষ্টা করে। ইভদোকিয়াকে নিজের মেয়ের মতোই দেখে কুজমা। কিন্তু ইভদোকিয়া মনে মনে কুজমাকে ভালোবাসে। কুজমার উদার হৃদয়ের জন্য কাঙাল সে। রোদকা থেকে কুজমার ভাই তিখন, সারা জীবন তাকে সবাই ভোগ করে এসেছে, কেউ ভালোবাসা দেয়নি। একমাত্র কুজমার কাছ থেকেই জীবনে সে প্রথম ভালোবাসা পেয়েছে। প্রতিদানে কুজমাকেও সে ভালোবাসা দিতে চায়। কিন্তু কুজমা তার মন বুঝতে অক্ষম। মেয়েটিকে নিজের কন্যার মতোই মনে করে সে। আর এই কারণেই কুজমার প্রতি মনে মনে কঠিন হয়ে ওঠে ইভদোকিয়া।

     ভাই কুজমার প্রতি ইভদোকিয়ার এই মনোভাব গোপন থাকে না তিখনের কাছে। ভাইকে দেখে মেয়েটি যেভাবে লজ্জা পায়, তাই তার মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। এই মেয়েটিকে একদিন সে ভোগ করেছে। কিন্তু বিনিময়ে সন্তান বা ভালোবাসা কোনওটাই পায়নি। মেয়েটির প্রতি বদলা নিতেই তিখন যেন তাকে দেনিসকার হাতে তুলে দেয়। বদলা, কারণ তিখন মনে মনে দেনিসকাকে ঘৃণা করে। অথচ সেই ঘৃণ্য মানুষটির হাতেই বাকি জীবনের জন্য মেয়েটিকে তুলে দেয় সে। কুজমা এই বিয়ে ঠেকাবার অনেক চেষ্টা করে। ইভদোকিয়া ওপর ওপর কুজমার প্রতি কঠোর মনোভাব দেখায়। কুজমার জ্বরের সময় যখন সে মেয়েটির কাছ থেকে সহানুভূতি আশা করে, মেয়েটি তখন বিরূপতা দেখিয়ে সরে থাকে। তার এই ব্যবহার কুজমাকে খুবই বিস্মিত করে। কুজমার প্রতি বদলা নিতেই মেয়েটি যেন বিয়েতে রাজি হয়, কারণ হিসাবে জানায়, ভিখারির মতো লোকের দোরে দোরে ভিক্ষা চেয়ে বাকি জীবন সে কাটাতে পারবে না, নিজের নিরাপত্তার কারণেই সে এই বিয়েতে রাজি হয়েছে। কিন্তু বিয়ের সময় ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মেয়েটি। তাকে বিদায় দিতে গিয়ে কুজমা ভেঙে পড়ে, চোখের জলে ভাসিয়ে দেয়। মেয়েটি ভয়ানকভাবে কাঁপতে থাকে। সে বুঝতে পারে, আবারও একটি পুরুষের ভোগের শিকার হতে চলেছে সে। জীবনে একমাত্র যে মানুষটি তাকে ভালোবেসেছিল, তার সঙ্গে চিরবিদায় মুহূর্ত আসন্ন।

     ইভদোকিয়ার বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই নিজের জমিদারীর ওপর থেকে সব টান চলে যায় তিখনের। বহুদিনের চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়, দুরনোভকা বিক্রি হয়ে যায়। কুজমা ফিরে যায় শহরে, যে শহর তার কাছে আসল দুনিয়া, মানুষ খবর আর খবরের কাগজে ভর্তি। যদিও নতুন যে রাশিয়া আসছে তার প্রতি কোনই আস্থা নেই কুজমার। দেনিসকা যেন এই নতুন রাশিয়ারই প্রতীক। ব্র্যান্ড নিউ টাইপ। পুরনো রাশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি চতুর ও কৌশলী। কুজমার মনে হয়, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল, সব বোধই তার গুলিয়ে গেছে। কোনও কিছুই সে ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না। সে বুঝতে পারছে না মানুষকে করুণা করা উচিত না ঘৃণা! মানুষের প্রতি কোনও আস্থা নেই তিখনেরও। সে তাই বলে, মানুষ হলো অলস, বাজে বকে, নির্লজ্জ মিথ্যাবাদী, কেউ কাউকে ভেতর থেকে বিশ্বাস করে না, সবাই ওরা একরকম। নিজেকে একটা চেনে বাঁধা শিকারী কুকুর মনে হয় তিখনের। সোনার খাঁচায় বন্দী। কারও প্রতি করুণা নেই তার। তাকেও সবাই ঘৃণা করে। জীবনটা আসলে একটা ছায়া, একটা স্বপ্ন। লোভ আর নির্বুদ্ধিতায় ভরা। জীবনে যা কিছু মূল্যবান মনে হয়, সবই আসলে বাজে ব্যাপার। অসার দম্ভই তাদের মূল্যবান করে তোলা।

এই উপন্যাস শেষ হয় প্রবল, প্রচণ্ড তুষারপাতের মধ্যে। মৃত্যু ও প্রেম, এই দু’টি বিষয় বারবার বুনিনের লেখায় ফিরে ফিরে আসে। প্রেমের কাহিনি রচনায় রুশ লেখকেরা গোটা বিশ্বে অতুলনীয়। বুনিনও কোনও ব্যতিক্রম নন। ‘দি ভিলেজ’ও আসলে একটি অনবদ্য প্রেমের কাহিনি। দুই ভাই ও একটি মেয়ে। এক ভাই মেয়েটিকে ভোগ করে, অপর ভাই স্নেহ করে। যে ভোগ করে তার প্রতি মেয়েটি উদাসীন, যে স্নেহ করে তাকে ভালোবাসে। শেষপর্যন্ত মেয়েটির ভাগ্যের কোনও বদল হয় না। প্রবল দুর্যোগের মতো মেয়েটির ভাগ্যও বিপর্যস্ত হতে থাকে। দুই ভাইয়ের জীবনেও একাকিত্ব ছাড়া আর কিছুই জোটে না। সারা জীবন ক্ষমতা ভোগ করে, প্রবল দাপুটে তিখন শেষ পর্যন্ত আত্মিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যায়, হতাশা ও শূন্যতায় মৃত্যুচিন্তা তাকে গ্রাস করে, সন্তান ও সুখী পরিবারের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় সারা জীবন। ক্ষমতাহীন ও মেধাবী কুজমা ভোগে প্রেমহীনতায়, গভীর বিষাদে আক্রান্ত হয় সে, সম্পূর্ণ একা হয়ে আবার শহরে ফেরে সে।

এই দুই ভাইয়ের মধ্য দিয়ে রাশিয়া ও তার মানুষের গভীর দুর্দশার ছবি দেখিয়েছেন বুনিন। গ্রামের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার আত্মাকেই স্পর্শ করতে চেয়েছেন তিনি এবং সেখানে নৈরাশ্য ছাড়া আর কিছুই টের পাননি। রাশিয়ার মহৎ স্রস্টারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবিক সাহিত্য রচনা করেছেন। আবার সেই রাশিয়াতেই জারের আমল থেকে স্তালিনের আমল পর্যন্ত মানুষের ওপর ভয়াবহ দমন, পীড়ন, অত্যাচার চালানো হয়েছে। এটা ভাবলে অবাকই লাগে, যে রাশিয়ায় তুর্গেনেভ, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেকভ, গোর্কি প্রমুখ মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার ও সহমর্মিতার শাশ্বত, মানবিক ছবি এঁকে গিয়েছেন, সেখানেই স্তালিন যুগে ১৯২৪-৫৩ সময়কালে শুধু রাজনৈতিকভাবে হত্যা করা হয়েছে প্রায় ২ কোটি মানুষকে। একই দেশে এই ভয়াবহ বৈপরীত্য দেখলে অবাক হতে হয়। স্তালিন যুগে যে হিংসা সর্বগ্রাসী আকার নিয়েছিল, তার গোড়া প্রোথিত ছিল রাশিয়ার জনজীবনের মধ্যেই। অভাব, দারিদ্র, দুর্দশা, নৈরাশ্যে পীরিত রাশিয়ার জনজীবনের সঙ্গে হিংসা ও বিশৃঙ্খলা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। বুনিনের গ্রামই আসল রাশিয়া। সেই আসল রাশিয়াকে সত্যনিষ্ঠা ও বাস্তববোধের সাহায্যে এক মহৎ শিল্পীর নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। দস্তয়েভস্কি ও তলস্তয়ের মতো কোনও ইউটোপিয়াকে প্রশ্রয় দেননি, যেখানে জীবনের মহৎ, দার্শনিক সত্যগুলি উঠে এলেও রাশিয়া হয়ে উঠেছে এক সার্বজনীন পরিসর, ওই দেশের খাঁটি বাস্তবতা সেখানে তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গোড়া শুদ্ধ উঠে আসেনি, অন্তত যেভাবে উঠে এসেছে বুনিনের প্রকৃত পূর্বসূরি লেসকভ বা শ্চেদ্রিনের রচনায়।

সমাপ্ত

 

রাহুল দাশগুপ্ত – “ ইভান বুনিনের ‘দি ভিলেজ’ ” ২
তৃষ্ণা বসাক – “ পানিবাই ” ১
Close My Cart
Close Wishlist

Close
Navigation
Categories

Add address

India